Wednesday, October 14, 2026
spot_img

ঘুড়ির ডানায় ঐতিহ্য ও নস্টালজিয়া, ব্যারাক অ্যাথলেটিক ক্লাবের ভাবনা ‘চাঁদিয়াল’

সুমন আদক, হাওড়া: মাটির টানে বাঁধা থেকেও স্বপ্ন যে ছুঁতে চায় আকাশ, সেই চিরন্তন অনুভূতিকেই এ বছর দুর্গাপুজোর মণ্ডপে শিল্পের ভাষায় তুলে ধরেছে হাওড়ার ব্যারাক অ্যাথলেটিক ক্লাব সার্বজনীন দুর্গোৎসব। ৫৬তম বর্ষে পা দিয়ে তাদের এবারের ভাবনা ‘চাঁদিয়াল’। বাংলার আকাশে রঙিন ঘুড়ির ওড়া, ছোটবেলার দুরন্ত স্মৃতি, লোকসংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের হাত ধরে দর্শকদের এক অন্য রকম শারদীয় শিল্পযাত্রার স্বাদ দিতে প্রস্তুত পুজো উদ্যোক্তারা। শুধু মণ্ডপসজ্জার অভিনবত্ব নয়, বাংলার হারিয়ে যেতে বসা এক পরিচিত ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই এই ভাবনার অন্যতম উদ্দেশ্য। ঘুড়ি বাঙালির কাছে নিছকই একটি বিনোদন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শৈশবের আনন্দ, উৎসবের উন্মাদনা, পাড়ার বন্ধুত্ব এবং খোলা আকাশে মুক্তির স্বপ্ন। সেই চেনা ঘুড়িকেই ত্রিমাত্রিক শিল্পভাষায় নতুন করে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছে ব্যারাক অ্যাথলেটিক ক্লাব। উদ্যোক্তাদের ভাবনায়, ‘চাঁদিয়াল’ কেবল একটি শিল্পসংস্থাপন নয়, বরং বাংলার ঘুড়িকে ঘিরে গড়ে ওঠা ইতিহাস, লোকগাথা, উৎসব এবং স্মৃতির এক শিল্পিত উপাখ্যান। পুরাণের অলৌকিক কাহিনী থেকে রেশম পথের ঐতিহাসিক যাত্রা, বিশ্বকর্মা পুজোর আকাশ থেকে দুর্গোৎসবের আবহ—বিভিন্ন অনুষঙ্গকে এক সুতোয় বেঁধে তৈরি হয়েছে এবারের শিল্পভাবনা। আকাশ, ঘুড়ি, আলো এবং স্মৃতির মেলবন্ধনে বাংলার ঐতিহ্যকে নতুন আঙ্গিকে অনুভব করার সুযোগ পাবেন দর্শনার্থীরা। এই ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে এক গভীর জীবনবোধও। ঘুড়ি যেমন সুতোয় বাঁধা থেকেও আকাশের দিকে উড়ে যেতে চায়, তেমনই মানুষও নিজের শিকড়কে আঁকড়ে ধরে স্বপ্নের সীমানা পেরিয়ে এগিয়ে যেতে চায়। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধনে সেই বার্তাকেই মণ্ডপসজ্জার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে পুজো কমিটি। সমগ্র ভাবনার রূপায়ণ ও মণ্ডপসজ্জার দায়িত্বে রয়েছে ‘হ্যালুসিনেশনস্’। ডেকোরেশনে কুণ্ডু ডেকোরেটর, আলোকসজ্জা ও সাউন্ডের দায়িত্বে এস কে ইলেকট্রিক্যাল এবং প্রতিমা নির্মাণে শিল্পী অমিত কর্মকার। সব মিলিয়ে ঘুড়ির রং, আকাশের বিস্তার এবং স্মৃতিমেদুর আবহে দর্শকদের কাছে ‘চাঁদিয়াল’ হয়ে উঠতে পারে এবারের পুজোর অন্যতম আকর্ষণ। ১৪ অক্টোবর, বুধবার চতুর্থীর সন্ধ্যায় ব্যারাক অ্যাথলেটিক ক্লাবের সংঘ ময়দানে ৫৬তম বর্ষের দুর্গাপুজোর শুভ উদ্বোধন। উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে থাকছে সঙ্গীতানুষ্ঠান, নৃত্য পরিবেশনা, বিভিন্ন শিল্পীর গান এবং ক্লাবের নিজস্ব থিম সং প্রকাশের আয়োজন। তবে ব্যারাক অ্যাথলেটিক ক্লাবের পুজো শুধুমাত্র শিল্প ও উৎসবের পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক দায়বদ্ধতাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। পুজো উপলক্ষে দুঃস্থ মানুষদের হাতে প্রয়োজনীয় সামগ্রী তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অষ্টমীর দুপুরে গোটা পাড়ার প্রায় ৪০০ জনের একসঙ্গে পাত পেড়ে খাওয়ার আয়োজন করা হবে। নবমীর ভোগ সারা পাড়ায় বিতরণ করা হবে। দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের পরেও থাকবে পাড়ার সকলকে নিয়ে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার ব্যবস্থা। অর্থাৎ, ‘চাঁদিয়াল’-এর ঘুড়ি যেমন আকাশের সঙ্গে মানুষের মেলবন্ধনের প্রতীক, তেমনই এই পুজো হয়ে উঠতে চায় পাড়ার মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও মিলনের এক উৎসব। হাওড়ার কদমতলার ৪০ ও ৪০/৪, সারদা চ্যাটার্জি লেনে, কদমতলা পাওয়ার হাউস পেট্রোল পাম্পের বিপরীতে অবস্থিত এই পুজো মণ্ডপে এবার তাই দর্শনার্থীদের জন্য অপেক্ষা করছে ঐতিহ্য, শিল্প, স্মৃতি ও সামাজিক বন্ধনের এক অনন্য সমাহার। রঙিন ঘুড়ির হাত ধরে শৈশবের আকাশে ফিরে যাওয়া, আবার সেই আকাশ থেকেই নতুন স্বপ্নের সন্ধান—ব্যারাক অ্যাথলেটিক ক্লাবের ৫৬তম বর্ষের ‘চাঁদিয়াল’ যেন সেই দুই যাত্রাকেই এক সুতোয় বেঁধে দিতে চায়।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

1,231FansLike
10FollowersFollow
4SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles