Monday, October 5, 2026
spot_img

ঐতিহ্যের অলিন্দে রাজকীয় আতিথেয়তা, হাওড়ার জাতীয় সেবাদলে এবার ‘বারিকুটি হেরিটেজ হোটেল’ এর আদলে মণ্ডপ

সুমন আদক, হাওড়া: সময়ের স্রোতে বদলে গিয়েছে জীবনযাত্রা, বদলেছে স্থাপত্যের ভাষা, বদলেছে মানুষের রুচি। তবু পুরনো দিনের জমিদারবাড়ি, রাজপ্রাসাদ কিংবা ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ আজও অমলিন। সেই হারিয়ে যেতে বসা আভিজাত্য, সাবেকি স্থাপত্যের নান্দনিকতা আর রাজকীয় আতিথেয়তার অনুভূতিকেই এবারের দুর্গোৎসবে নতুনভাবে তুলে ধরতে চলেছে হাওড়ার জাতীয় সেবাদল ক্লাব। পুজোর ৯৩তম বর্ষে তাদের ভাবনায় উঠে এসেছে ‘বারিকুটি হেরিটেজ হোটেল’। এটি শুধুমাত্র একটি মণ্ডপ নির্মাণের পরিকল্পনা নয়, বরং অতীতের ঐতিহ্যকে বর্তমানের উৎসবের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার এক অভিনব প্রয়াস। প্রায় ৩২ লক্ষ টাকা বাজেটের এই পুজোয় দর্শনার্থীরা মণ্ডপে প্রবেশ করেই যেন অনুভব করতে পারেন এক অন্য সময়ের আবহ, যেখানে স্থাপত্যের প্রতিটি বাঁক, অলংকরণের প্রতিটি রেখা এবং আলোর প্রতিটি বিন্যাসে ফুটে উঠবে আভিজাত্যের নিজস্ব ভাষা। হাওড়ার বিগ বাজেটের পুজোগুলির মধ্যে জাতীয় সেবাদলের পুজো দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষ পরিচিতি ধরে রেখেছে। প্রতিবছর নতুন ভাবনা ও পরিকল্পনায় দর্শকদের সামনে হাজির হওয়াই এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

তবে এবারের থিমে চমকের পাশাপাশি রয়েছে ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নান্দনিকতার বিশেষ গুরুত্ব। হেরিটেজ হোটেলের ধারণার মধ্যে সাধারণত জড়িয়ে থাকে অতীতের স্থাপত্য, পুরনো দিনের জীবনযাত্রা, ঐতিহ্যবাহী অলংকরণ এবং রাজকীয় পরিবেশের স্মৃতি। সেই সমস্ত বৈশিষ্ট্যকে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে তুলে ধরার লক্ষ্যেই এগোচ্ছেন পুজো উদ্যোক্তারা। মণ্ডপ নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে শালখুঁটি, বাঁশ, ফোম শিট, কাপড়, বাটাম-সহ একাধিক উপকরণ। নির্মাণশৈলীতে প্রাচীন স্থাপত্যের আদল বজায় রাখার পাশাপাশি সূক্ষ্ম কারুকার্য ও আধুনিক পরিকল্পনার সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে মণ্ডপের সামগ্রিক রূপে সাবেকি ঐতিহ্য এবং সমকালীন শিল্পভাবনার একটি সেতুবন্ধন তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু মণ্ডপের বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, প্রতিমার মধ্যেও সেই ঐতিহ্যের ছাপ রাখার পরিকল্পনা করেছেন এখানকার পুজো উদ্যোক্তারা। এবারের প্রতিমা নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছেন পদ্মশ্রী সম্মানপ্রাপ্ত বিশিষ্ট শিল্পী সনাতন রুদ্র পাল। তাঁর শিল্পকুশলতায় সাবেকি ঘরানার প্রতিমার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার রুদ্রাণী রূপ ফুটে উঠবে। মণ্ডপের স্থাপত্য এবং প্রতিমার শিল্পরূপের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখাই এবারের পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। এর সঙ্গে যুক্ত হবে বিশেষ আলোকসজ্জা। আলো-আঁধারির বিন্যাসে হেরিটেজ হোটেলের রাজকীয় পরিবেশকে আরও জীবন্ত করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সন্ধ্যা নামার পর আলোর কারুকার্যে মণ্ডপের স্থাপত্য যে অন্য মাত্রা পাবে, সেই প্রত্যাশাই করছেন উদ্যোক্তারা। তবে জাতীয় সেবাদলের দুর্গোৎসব কেবল শিল্প ও সাজসজ্জার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিনের এই উৎসবকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের আবেগ, মিলন এবং সামাজিক সম্প্রীতিরও একটি বিশেষ জায়গা রয়েছে।

মহালয়ার আবহ থেকে শুরু করে পুজোর দিনগুলিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাচ, গান-সহ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসবের পরিসরকে আরও বিস্তৃত করা হবে। আগামী ১৪ অক্টোবর মহাচতুর্থীর দিন পুজোর উদ্বোধন হতে চলেছে। অনুষ্ঠানে কেন্দ্র ও রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের মন্ত্রী-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। ভিড় সামলানো এবং যাতায়াতে সহযোগিতার জন্য মোতায়েন থাকবেন স্বেচ্ছাসেবকেরা। হাওড়া স্টেশন থেকে কদমতলাগামী বাসে বেলিলিয়াস লেন স্টপেজে নেমে সহজেই পুজো প্রাঙ্গণে পৌঁছনো যাবে। হাওড়া ময়দান থেকেও সড়কপথে মণ্ডপে আসা সম্ভব। আগামী ২৪ অক্টোবর বিকেল চারটেয় ঢাকের বাদ্যি ও ধুনুচি নাচের আবহে প্রতিমা নিরঞ্জনের আয়োজন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৯৩ বছরের পথচলাকে সঙ্গী করে জাতীয় সেবাদলের এবারের আয়োজন হয়ে উঠতে চলেছে ঐতিহ্য ও উৎসবের এক অনন্য মেলবন্ধন। ‘বারিকুটি হেরিটেজ হোটেল’-এর ভাবনায় দর্শনার্থীরা শুধু একটি পুজোমণ্ডপ দেখবেন না, বরং দুর্গোৎসবের আনন্দের মধ্য দিয়ে ফিরে দেখার সুযোগ পাবেন অতীতের স্থাপত্য, সংস্কৃতি এবং রাজকীয় জীবনযাপনের এক কল্পিত জগৎ।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

1,231FansLike
10FollowersFollow
4SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles