সুমন সরদার : বয়স ৩৯, তবু ইতিহাস লেখা থামেনি। ২০২৬ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি এখন এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
কেউ ভেবেছিল ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালের রাতেই হয়তো শেষ হয়ে যাবে সব। লুসাইলের সেই জাদুকরী রাতে আর্জেন্তিনার হাতে বিশ্বকাপ তুলে দিয়ে মেসি হয়তো চুপ করে সরে যাবেন। কিন্তু না। তিন বছর পরে উত্তর আমেরিকার মাঠে ৩৮ বছরের এক মানুষ আবার প্রমাণ করলেন কিংবদন্তিরা থামতে জানেন না।
২০২৬ বিশ্বকাপে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলেই মেসি ভেঙে ফেলেছেন একের পর এক রেকর্ড, যেগুলো হয়তো কয়েক দশকেও কেউ ভাঙতে পারবেন না।
ছয়টি বিশ্বকাপ
২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং এখন ২০২৬ মেসি হলেন প্রথম পুরুষ ফুটবলার যিনি ছয়টি আলাদা বিশ্বকাপে খেলেছেন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামার সাথে সাথেই সেই ইতিহাস লেখা হয়ে যায়। পরে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোও তাঁর সঙ্গে এই রেকর্ডে নাম লেখান, তবে মেসিই প্রথম এই মাইলফলক স্পর্শ করেন।
৩৮ বছর বয়সে হ্যাটট্রিক সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড়
আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে মেসি করলেন হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটি ছিল তাঁর প্রথম হ্যাটট্রিক, এবং ৩৮ বছর ৩৫৭ দিন বয়সে তিনি হয়ে গেলেন বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড়। এই রেকর্ড আগে ছিল ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর দখলে।
২০০তম ম্যাচ, ঠিক ২০ বছর পরে
আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল ঠিক সেই তারিখে ১৬ জুন যেদিন ২০ বছর আগে ২০০৬ সালে সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রোর বিপক্ষে বিশ্বকাপে প্রথম গোল করেছিলেন মেসি। আর এই ম্যাচটিই ছিল আর্জেন্তিনার হয়ে তাঁর ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ইতিহাসে এমন কাকতালীয় ঘটনা কদাচিৎ ঘটে।
বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ২২ জুনের রাত। ৩৮তম মিনিটে বাঁ পায়ের এক টাইমড শটে মেসি ভেঙে ফেললেন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোজের দীর্ঘদিনের রেকর্ড, হয়ে গেলেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা। তাঁর গোলসংখ্যা পৌঁছাল ১৭-তে, তারপর স্টপেজ টাইমে আরেকটি গোল করে সেটা হলো ১৮।
এই ১৮তম গোলটি তাঁকে শুধু পুরুষদের নয়, নারীদের বিশ্বকাপ মিলিয়েও সর্বোচ্চ গোলদাতা বানিয়ে দিল। তিনি ব্রাজিলের কিংবদন্তি মার্তার ১৭ গোলকেও পেছনে ফেলেদিলেন।
এক রাতে চারটি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস
অস্ট্রিয়া ম্যাচের পর গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস চারটি নতুন রেকর্ড স্বীকার করে নেয়। মেসি এখন ধারণ করছেন সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোল যা ১৮ টি, সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ ম্যাচে অংশগ্রহণ যা ২৮ টি, সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ ম্যাচ জয় যা ১৮ টি , এবং সর্বোচ্চ মিনিট খেলার রেকর্ড যা ২,৪৮৯ মিনিট ।
আর কোন রেকর্ড সামনে?
মেসি এখন আর্জেন্তিনার হয়ে ১২২টি আন্তর্জাতিক গোল করেছেন, কেবল ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো ১৪৩ গোল তাঁর সামনে। আর্জেন্তিনা যদি ফাইনাল পর্যন্ত যায়, তাহলে মেসি হতে পারেন একমাত্র খেলোয়াড় যিনি দুটি বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়কত্ব করেছেন, এবং তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলার বিরল কৃতিত্বও অর্জন করতে পারেন।

মহারাজা তোমারে সেলাম
মেসি ৩৫ বছর বয়সের পর থেকে বিশ্বকাপে যতগুলো গোল করেছেন, সেটা ম্যারাডোনা, রিভালদো, থিয়েরি অঁরি, রোমারিও, নেইমার বা হ্যারি কেনের পুরো বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের চেয়েও বেশি।
বয়স সংখ্যা মাত্র, এই কথাটা মেসি প্রতিটি ম্যাচে নতুন করে প্রমাণ করছেন। ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম এখন এমনভাবে লেখা হয়ে গেছে, যা মুছে ফেলা সম্ভব নয়।



