সুমন আদক, হাওড়া: শহরের ঝলমলে থিমের পুজো কিংবা বড় বড় বারোয়ারি আয়োজনের ভিড়ে আজও নিজস্ব ঐতিহ্য ও পারিবারিক রীতিকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে হাওড়ার এক বনেদি পরিবার। জয়নারায়ণ বাবু ও আনন্দ দত্ত লেনের আদক বাড়ির কালীপুজো যেন কেবলই দেবী আরাধনা নয়, বরং ভক্তি, আবেগ ও পারিবারিক বন্ধনের এক অনন্য উত্তরাধিকার। এবছর ৩৬ বছরে পদার্পণ করল এই পারিবারিক পুজো। সাবেকি রীতিতে সনাতনী প্রতিমায় পূজিতা হন দেবী। প্রতিমাকে নির্দিষ্ট বেদিতে প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং বছরভর চলে তাঁর নিত্যসেবা। দীপান্বিতা অমাবস্যার পুণ্যলগ্নে এক প্রহরে বিশেষ নিয়ম-নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন হয় দেবীর আরাধনা। দেবীর রূপে নেই কোনও আড়ম্বরের চাকচিক্য, বরং রয়েছে শান্ত ও স্নিগ্ধ আবহ। সেই শান্তির পরশই যেন আদক বাড়ির কালীপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পুজোকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই বাড়িতে শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি। সাজিয়ে তোলা হয় বাড়ির অন্দরমহল। পরিবারের সদস্যরাই প্রতিমা আনা থেকে শুরু করে পুজোর যাবতীয় আয়োজনের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেন। সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ ও আন্তরিকতায় পারিবারিক এই উৎসব হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত। শুধু কালীপুজোর রাতেই নয়, সারা বছর ধরেই দেবীর আরাধনা চলে নির্দিষ্ট নিয়মে। পরিবারের কুলপুরোহিত প্রতি শনি ও মঙ্গলবার দেবীর নিত্যপুজো করেন। এছাড়াও প্রতি অমাবস্যায় বিশেষভাবে সাজিয়ে তোলা হয় দেবীকে এবং আয়োজন করা হয় বিশেষ পুজোর। এই পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব হল, এখানে কোনও বলিপ্রথা নেই। ভক্তিভরে দেবীর কাছে মানত করেন বহু মানুষ। মনোবাসনা পূর্ণ হলে ভক্তরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী দেবীর চরণে অর্পণ করেন তাঁদের শ্রদ্ধার্ঘ্য। পরিবারের সদস্যদের কথায়, একসময় ছোট আকারের প্রতিমা দিয়ে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে প্রতিমার আকার বড় হলেও পুজোর মূল ভাবনা ও পারিবারিক রীতিতে কোনও পরিবর্তন আসেনি। কালীপুজোর রাতে বিশেষ আরাধনার পাশাপাশি ভক্ত ও দর্শনার্থীদের মধ্যে প্রসাদ এবং অন্ন বিতরণের আয়োজনও থাকে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় যখন পুজোর আয়োজনের ধরন বদলাচ্ছে, তখন আদক বাড়ির এই কালীপুজো মনে করিয়ে দেয় বাড়ির পুজোর আসল সৌন্দর্য আড়ম্বরের মধ্যে নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে বয়ে চলা বিশ্বাস, নিষ্ঠা ও ঐতিহ্যের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।



