নিজস্ব প্রতিনিধি : ২৮ জুলাই, ২০২৬ বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি গ্রহণ এবং মজবুত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার মাধ্যমে ভারত বাঘ সংরক্ষণে বিশ্বনেতা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ বাঘের আবাসস্থল ভারত।
প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং জনসংযোগ বাঘ সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এনে দিয়েছে। একই সঙ্গে বাঘ ও তাদের আবাসস্থলের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে ভারত বৈশ্বিক সহযোগিতাও জোরদার করছে।
প্রতি বছর ২৯ জুলাই আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবস পালিত হয়। এই প্রচেষ্টা বিশ্বব্যাপী বাঘ সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে। ভারতের ক্ষেত্রে এই দিনটি বিজ্ঞানভিত্তিক সংরক্ষণ এবং সুস্থায়ী উন্নয়নের প্রতি সরকারের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারকে পুনর্ব্যক্ত করে। একই সঙ্গে এটি বাঘ সংরক্ষণে ভারতের উল্লেখযোগ্য সাফল্যকেও তুলে ধরে। বর্তমানে বিশ্বের সর্বাধিক বন্য বাঘের আবাসস্থল ভারত, যেখানে বিশ্বের মোট বন্য বাঘের প্রায় ৭০ শতাংশ বাস করে। এই সাফল্য দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক নীতিগত সহায়তা, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা এবং জনসহযোগিতার ফল, যা বাঘ সংরক্ষণে ভারতকে বিশ্বের অন্যতম অগ্রণী দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এই সাফল্যের ভিত্তি ভারতের সঙ্গে বাঘের গভীর সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত সম্পর্ক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রাচীন মুদ্রা, রাজমোহর এবং মন্দিরের ভাস্কর্যে বাঘকে শক্তি ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে। এই ঐতিহ্যকে স্বীকৃতি দিয়ে ১৯৭২ সালে সরকার রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারকে ভারতের জাতীয় প্রাণী হিসাবে ঘোষণা করে। আজও বাঘ ভারতের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং দেশের বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতিজুড়ে বিস্তৃত অভিন্ন প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
সাংস্কৃতিক গুরুত্বের পাশাপাশি, বাঘ পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শীর্ষ শিকারি (Apex Predator) এবং আমব্রেলা প্রজাতি (Umbrella Species) হিসাবে এটি সুস্থ বনভিত্তিক বাস্তুতন্ত্র বজায় রাখতে সহায়তা করে। বাঘের আবাসস্থল সংরক্ষণ মানে বন, নদী এবং অগণিত অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতিকে সুরক্ষিত রাখা। এই বনাঞ্চল জলসম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে, মাটির ক্ষয় রোধ করে, পরাগায়নে সহায়তা করে এবং স্থানীয় জলবায়ুর ভারসাম্য বজায় রাখে। পাশাপাশি, এগুলি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমায় এবং এমন নানা পরিবেশগত পরিষেবা প্রদান করে, যা গ্রামীণ জীবিকা ও নগর অর্থনীতিকে সমর্থন করে। বাঘ ও তার আবাসস্থল সংরক্ষণে সরকার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে আরও শক্তিশালী করছে, পরিবেশগত নিরাপত্তা বৃদ্ধি করছে এবং সুস্থায়ী উন্নয়নের মাধ্যমে ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলেছে।
আপনি কি জানেন?
আন্তর্জাতিক বাঘ দিবসের সূচনা হয় ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত সেন্ট পিটার্সবার্গ টাইগার সামিট থেকে। ভারত-সহ বাঘের আবাসস্থল থাকা ১৩টি দেশের নেতারা ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বে বন্য বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার উচ্চাভিলাষী Tx2 লক্ষ্য গ্রহণ করেন। বর্তমানে এই দিনটি সংরক্ষণে অগ্রগতি পর্যালোচনা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির একটি সার্বিক মঞ্চ হিসাবে কাজ করছে। ২০১০ সালে বিশ্বে আনুমানিক মাত্র ৩,২০০টি বন্য বাঘ অবশিষ্ট ছিল। উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বৈজ্ঞানিক নজরদারির ফলে ২০২২ সালে এই সংখ্যা বেড়ে আনুমানিক ৪,৫০০-তে পৌঁছায়, যার সম্ভাব্য পরিসর ছিল ৩,৭০০ থেকে ৫,৬০০। সাম্প্রতিক সামগ্রিক হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৫,৭১১টি বন্য বাঘ রয়েছে, যা ২০১০ সালের তুলনায় প্রায় ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি: সংকট থেকে পুনরুত্থান
বাঘ সংরক্ষণে ভারতের উদ্যোগ আজ বন্যপ্রাণী পুনরুদ্ধারের একটি বিশ্বস্বীকৃত মডেল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০০৬ সালের পর থেকে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, দেশে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। অল ইন্ডিয়া টাইগার এস্টিমেশন (২০২২) অনুযায়ী, ভারতে বাঘের সংখ্যা ৩,৬৮২। ২০২২ সালের এই সমীক্ষায় দেশের ২০টি রাজ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং ৬.৪১ লক্ষ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকা পদব্রজে সমীক্ষা করা হয়। এটি বিশ্বের বৃহত্তম এবং সর্বাধিক বিস্তৃত বন্যপ্রাণী সমীক্ষাগুলির অন্যতম। এই উল্লেখযোগ্য সাফল্য ধারাবাহিক নীতিগত সহায়তা, বিজ্ঞানভিত্তিক সংরক্ষণ এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন। দীর্ঘমেয়াদী আবাসস্থল সংরক্ষণ, কঠোর নজরদারি এবং সমন্বিত বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভারতজুড়ে বাঘ সংরক্ষণ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
বাঘ সংরক্ষণে শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো
বাঘ সংরক্ষণে ভারতের নীতিগত কাঠামো দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে জাতীয় ও রাজ্য স্তরে ধারাবাহিক প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার সমন্বয় ঘটিয়েছে। ‘প্রজেক্ট টাইগার’, ‘ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি (NTCA)’ এবং ‘টাইগার কনজারভেশন প্ল্যান’- এই তিনটি উদ্যোগ মিলিতভাবে বাঘের আবাসস্থল সংরক্ষণের জন্য একটি শক্তিশালী ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছে।
প্রজেক্ট টাইগার
প্রজেক্ট টাইগার’ ভারত সরকারের একটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত প্রকল্প। এটি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক (MoEFCC) দ্বারা বাস্তবায়িত হয়। এই প্রকল্পের লক্ষ্য বাঘের প্রাকৃতিক আবাসস্থলে তাদের সুস্থায়ী জনসংখ্যা নিশ্চিত করা। সংরক্ষণ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য বাঘ-অধ্যুষিত রাজ্যগুলিকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হয়। আবাসস্থল সংরক্ষণ, বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত ক্ষেত্রভিত্তিক পর্যবেক্ষণের সমন্বয়ে এই কর্মসূচি পরিচালিত হয়। এই পদ্ধতির ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাঘ সংরক্ষণের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়েছে।
ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি (NTCA)-র ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘প্রজেক্ট টাইগার’-এর আওতায় দেশের ১৮টি বাঘ-অধ্যুষিত রাজ্যে ৫৮টি টাইগার রিজার্ভের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। এই রিজার্ভগুলির মোট আয়তন প্রায় ৮৪,৫০০ বর্গকিলোমিটার, যা ভারতের মোট ভৌগোলিক এলাকার প্রায় ২.৫৬ শতাংশ। বর্তমানে ‘প্রজেক্ট টাইগার’ ভারতের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ প্রচেষ্টার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং বাঘ ও তাদের আবাসস্থল রক্ষায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটায়।
আপনি কি জানেন?
বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আইন, ১৯৭২-এর (Wildlife Protection Act, 1972) ধারা ৩৮ ভি (৩) অনুযায়ী, প্রত্যেক রাজ্য সরকারকে প্রতিটি টাইগার রিজার্ভের জন্য একটি ‘টাইগার কনজারভেশন প্ল্যান’ প্রণয়ন করতে হয়। এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হল, টাইগার রিজার্ভগুলির সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বাঘ, সহ-শিকারি (co-predators) ও শিকার প্রাণীর সুস্থায়ী জনসংখ্যা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় আবাসস্থল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি (NTCA)
NTCA ‘প্রজেক্ট টাইগার’ এবং সংশ্লিষ্ট সংরক্ষণমূলক উদ্যোগগুলির বাস্তবায়ন তদারকি করে। এটি বাঘ-অধ্যুষিত রাজ্যগুলিকে বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত এবং আর্থিক সহায়তা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করে। সংস্থাটি টাইগার কনজারভেশন প্ল্যান অনুমোদন করে এবং টাইগার রিজার্ভগুলির ব্যবস্থাপনার জন্য স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) জারি করে। পাশাপাশি, নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে টাইগার রিজার্ভগুলির ব্যবস্থাপনাও পর্যবেক্ষণ করে। NTCA-র বিজ্ঞানভিত্তিক এই পদ্ধতি আবাসস্থল সংরক্ষণকে আরও শক্তিশালী করে, সংরক্ষণমূলক উদ্যোগের সাফল্য বাড়ায় এবং ভারতজুড়ে বন্য বাঘের দীর্ঘমেয়াদী অস্তিত্ব নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।
আপনি কি জানেন?
NTCA-র চেয়ারম্যান হলেন কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী। এছাড়াও, এই কর্তৃপক্ষের সদস্য হিসেবে রয়েছেন সংসদ সদস্য, ঊর্ধ্বতন সরকারি আধিকারিক এবং বিশেষজ্ঞরা। এই সংস্থা বাঘ সংরক্ষণে নীতিগত দিকনির্দেশনা প্রদান করে, টাইগার রিজার্ভগুলির তদারকি করে এবং সারা দেশে ‘প্রজেক্ট টাইগার’-এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে।
টাইগার টাস্ক ফোর্স
ভারত সরকার বাঘ সংরক্ষণ-সংক্রান্ত নীতিগুলির পুনর্মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ করার জন্য ‘টাইগার টাস্ক ফোর্স’ গঠন করে। এই টাস্ক ফোর্স ভারতের বাঘ সংরক্ষণ কাঠামো পর্যালোচনা করে এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সংস্কারের সুপারিশ করে। এতে প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। টাস্ক ফোর্স স্বচ্ছতা, জনসহযোগিতা এবং ‘প্রজেক্ট টাইগার’-এর জন্য আরও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ওপর জোর দেয়। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে আরও দৃঢ় সংরক্ষণ কাঠামো গড়ে ওঠে। এর ফলস্বরূপ, ২০০৬ সালে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আইনে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আনা হয়। ওই সংশোধনের মাধ্যমে ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি (NTCA) এবং ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ব্যুরো (WCCB)-কে আইনগত (Statutory) সংস্থা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
ভারতের বাঘ সংরক্ষণ কাঠামো একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক মডেলের প্রতিফলন, যা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এবং সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার (Cooperative Federalism) ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই সমন্বিত পদ্ধতি একদিকে যেমন বাঘের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে সহায়তা করছে, তেমনি ভারতের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকেও আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
আপনি কি জানেন?
ভারতের টাইগার রিজার্ভগুলিতে ভূদৃশ্যভিত্তিক (Landscape-based) সংরক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। প্রতিটি রিজার্ভে একটি কোর এরিয়া (Core Area), যা ‘ক্রিটিক্যাল টাইগার হ্যাবিট্যাট’ নামেও পরিচিত এবং একটি বাফার এরিয়া (Buffer Area) থাকে। কোর এরিয়াগুলিকে সর্বোচ্চ স্তরের সুরক্ষা প্রদান করা হয়। বাফার এরিয়ায় সংরক্ষণ এবং সুস্থায়ী জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। এছাড়া, বিভিন্ন টাইগার রিজার্ভকে সংযুক্ত করে বন্যপ্রাণী করিডর (Wildlife Corridors), যা বাঘের নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করে এবং বিস্তীর্ণ ভূদৃশ্য জুড়ে সুস্থ বাঘের জনসংখ্যা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
ভারতে বাঘের পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন
ভারত বাঘের সংখ্যা পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য একটি শক্তিশালী বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এই পদ্ধতিতে ক্ষেত্রসমীক্ষা, ক্যামেরা ট্র্যাপ, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের সমন্বয় করা হয়। এর মাধ্যমে বাঘের সংখ্যা, শিকার প্রাণীর প্রজাতি এবং আবাসস্থলের গুণগত মান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এই তথ্য প্রমাণভিত্তিক সংরক্ষণ পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং অভিযোজনভিত্তিক (Adaptive) ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের ফলে, আবাসস্থল সংরক্ষণ আরও শক্তিশালী হয় এবং বিভিন্ন টাইগার ল্যান্ডস্কেপে তথ্যনির্ভর ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়।
অল ইন্ডিয়া টাইগার এস্টিমেশন (AITE): বিশ্বের বৃহত্তম জীববৈচিত্র্য সমীক্ষা
AITE বিশ্বের বৃহত্তম জীববৈচিত্র্য সমীক্ষা। প্রতি চার বছর অন্তর এই সমীক্ষা পরিচালিত হয়। এটি ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি (NTCA)-র নেতৃত্বে এবং ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া (WII)-র সহযোগিতায় পরিচালিত হয়। এই সমীক্ষার মাধ্যমে বাঘ-অধ্যুষিত সমস্ত রাজ্যে বাঘের সংখ্যা, সহ-শিকারি (Co-predators), শিকার প্রজাতি এবং আবাসস্থলের গুণগত মান মূল্যায়ন করা হয়। ২০২২ সালের সমীক্ষায় ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সারা দেশে খুরযুক্ত বন্য তৃণভোজী প্রাণীদের (Ungulates) সমীক্ষাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই উদ্যোগ সুস্থ শিকার প্রাণীর জনসংখ্যা যে সুস্থায়ীভাবে বাঘের জনসংখ্যা বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
আপনি কি জানেন?
অল ইন্ডিয়া টাইগার এস্টিমেশন বিশ্বের বৃহত্তম জীববৈচিত্র্য সমীক্ষা হিসাবে স্বীকৃত। NTCA-র ক্যামেরা ট্র্যাপ সমীক্ষা বিশ্বের বৃহত্তম ক্যামেরা ট্র্যাপভিত্তিক বন্যপ্রাণী সমীক্ষা হিসাবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড অর্জন করেছে। উন্নত প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যবেক্ষণের সমন্বয়ে ভারতের বাঘ গণনা বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর ও নির্ভুল সমীক্ষাগুলির অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ
ভারত বাঘ পর্যবেক্ষণের প্রতিটি ধাপে উন্নত ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করেছে। মনিটরিং সিস্টেম ফর টাইগার্স – ইনটেনসিভ প্রোটেকশন অ্যান্ড ইকোলজিক্যাল স্ট্যাটাস (M-STrIPES) মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণের জন্য GPS, GPRS এবং রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে। GPS-সংযুক্ত আলোকচিত্র তথ্যের নির্ভুলতা বাড়ায় এবং মানবজনিত ত্রুটি কমায়। এই প্ল্যাটফর্ম মাঠপর্যায়ে সংগৃহীত তথ্যকে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেসে সংযুক্ত করে, যা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও (Artificial Intelligence) এই পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছে। ক্যামেরা ট্র্যাপ ডেটা রিপোজিটরি অ্যান্ড অ্যানালিসিস টুল (CaTRAT) স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্যামেরা ট্র্যাপের ছবিগুলিকে বিভিন্ন প্রজাতি অনুযায়ী শ্রেণীবদ্ধ করে। ExtractCompare প্রতিটি বাঘের স্বতন্ত্র ডোরার নকশা বিশ্লেষণ করে তাদের পৃথকভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম। সম্মিলিতভাবে এই প্রযুক্তিগুলি বাঘের সংখ্যা নির্ধারণের নির্ভুলতা এবং নির্ভরযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে।
ম্যানেজমেন্ট ইফেক্টিভনেস ইভ্যালুয়েশন (MEE)
MEE-এর মাধ্যমে টাইগার রিজার্ভগুলির ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা মূল্যায়ন করা হয়। এই কাঠামোর আওতায় পরিকল্পনা, সুরক্ষা, ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া এবং সংরক্ষণের ফলাফল মূল্যায়ন করা হয়। এটি ব্যবস্থাপনাগত ঘাটতি চিহ্নিত করতে এবং জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। ২০২২ সাল পর্যন্ত এই কাঠামোর অধীনে ৫১টি টাইগার রিজার্ভের মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি রিজার্ভ “Excellent” বা ‘অসাধারণ’ রেটিং অর্জন করেছে এবং গড় ব্যবস্থাপনা স্কোর ছিল ৭৮ শতাংশ। এই মূল্যায়নের ফলাফল নীতিনির্ধারণে সহায়তা করে, টাইগার রিজার্ভগুলির ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করে এবং দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণ পরিকল্পনাকে সমর্থন করে।
বাঘ সংরক্ষণে বিশ্বে ভারতের নেতৃত্ব, বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ জোরদার করতে ভারত যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করছে তা বলাই বাহূল্য। এর মধ্যে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। মায়ানমারের সঙ্গে সহযোগিতার মূল লক্ষ্য অবৈধ কাঠ পাচার রোধ এবং বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ। এছাড়া, ক্যামেরা ট্র্যাপ তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং ইন্ডো-রাশিয়া ওয়ার্কিং সাব-গ্রুপ অন টাইগার অ্যান্ড লেপার্ড কনজারভেশন-এর মাধ্যমে রাশিয়ার সঙ্গেও ভারত যৌথভাবে কাজ করছে। বতসোয়ানা, দক্ষিণ আফ্রিকা, গুয়াতেমালা, কম্বোডিয়া, কেনিয়া এবং নামিবিয়ার সঙ্গে অংশীদারিত্ব বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা এবং জীববৈচিত্র্যের সুস্থায়ী ব্যবহারে সহায়তা করছে। বাঘ সংরক্ষণে চীনের সঙ্গেও ভারত দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা গড়ে তুলেছে। এই আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বগুলি বিজ্ঞান, সহযোগিতা এবং যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে বৈশ্বিক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ভারতের দৃঢ় অঙ্গীকারকে আরও সুসংহত করেছে।
ইন্টারন্যাশনাল বিগ ক্যাট অ্যালায়েন্স (IBCA)
IBCA হল ৯৫টি বৃহৎ বিড়ালজাতীয় প্রাণীর (Big Cat) আবাসভূমি-সম্পন্ন ও অংশীদার দেশ, বৈজ্ঞানিক সংস্থা এবং সংরক্ষণ অংশীদারদের নিয়ে গঠিত একটি বৈশ্বিক জোট। এই জোট সাতটি বৃহৎ বিড়ালজাতীয় প্রাণী—বাঘ, সিংহ, চিতাবাঘ, তুষার চিতাবাঘ, চিতা (Cheetah), জাগুয়ার এবং পুমা—সংরক্ষণের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করে। ২০২৪ সালের ১২ মার্চ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা (Union Cabinet) IBCA গঠনের অনুমোদন দেয় এবং এর সচিবালয়ের সদর দপ্তর ভারতে স্থাপন করা হয়। বাঘ সংরক্ষণে ভারতের বিশ্বস্বীকৃত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা IBCA বৃহৎ বিড়ালজাতীয় প্রাণী এবং তাদের আবাসস্থল রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করছে।
গ্লোবাল টাইগার ফোরাম (GTF)
GTF হল বিশ্বের একমাত্র আন্তঃসরকারি সংস্থা, যেটি একমাত্র বাঘ সংরক্ষণে নিবেদিত। এর সদর দপ্তর নয়াদিল্লিতে অবস্থিত। এই ফোরামে বাঘ-অধ্যুষিত ১৩টি দেশ—বাংলাদেশ, ভুটান, কম্বোডিয়া, চিন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, লাও পিডিআর (Lao PDR), মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, নেপাল, রাশিয়া, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনাম—অংশগ্রহণ করে। এই ফোরাম বাঘ, তাদের শিকার প্রাণী এবং আবাসস্থল সংরক্ষণের জন্য একটি অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে কাজ করে। এটি বৃহৎ ভূদৃশ্যভিত্তিক সংরক্ষণ, আঞ্চলিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে, যাতে সদস্য দেশগুলিতে বাঘ সংরক্ষণ আরও শক্তিশালী হয়। জ্ঞান বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে GTF বিশ্ব বাঘ সংরক্ষণে ভারতের নেতৃত্বকে আরও সুদৃঢ় করে।
ইন্টিগ্রেটেড টাইগার হ্যাবিট্যাট কনজারভেশন প্রোগ্রাম (ITHCP)
ITHCP হল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (IUCN)-এর অন্যতম প্রধান বাঘ সংরক্ষণ কর্মসূচি। এটি জার্মান সরকারের অর্থায়নে KfW ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই কর্মসূচি এশিয়ার অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বাঘের আবাসভূমিগুলিতে বিজ্ঞানভিত্তিক সংরক্ষণ প্রকল্পকে সমর্থন করে। এটি আবাসস্থল সংরক্ষণ, বৃহৎ ভূদৃশ্যভিত্তিক সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে উৎসাহিত করে। ভারত সক্রিয়ভাবে ITHCP-এর বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করছে, যা বাঘ এবং তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণে আঞ্চলিক প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করছে।
আপনি কি জানেন?
কনজারভেশন অ্যাসিওরড টাইগার স্ট্যান্ডার্ডস (CA|TS) হল একটি বৈশ্বিক স্বীকৃতি ব্যবস্থা, যা বিশেষভাবে বাঘ সংরক্ষণ এলাকাগুলির কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে। ২০১৩ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত প্রথম এশিয়ান পার্কস কংগ্রেসে এটি চালু হয়। এই মানদণ্ডে সুরক্ষা, আবাসস্থল ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ এবং বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণ করা হয়েছে। CA|TS বাঘের জন্য নিরাপদ ও টেকসই পরিবেশ গড়ে তোলা এবং বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে। বর্তমানে ভারতের ২৩টি টাইগার রিজার্ভ CA|TS-এর স্বীকৃতি অর্জন করেছে, যা সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের প্রমাণ বহন করে।
আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ভারত সীমান্ত অতিক্রম করে বাঘ সংরক্ষণে যৌথ উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করছে। জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সর্বোত্তম সংরক্ষণ পদ্ধতির আদান-প্রদানের মাধ্যমে ভারত বাঘ এবং তাদের আবাসস্থল রক্ষায় বৈশ্বিক প্রচেষ্টাকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।
বাঘের নিরাপদ ভবিষ্যৎ
বাঘ সংরক্ষণ ভারতের কাছে একটি গতিশীল এবং ক্রমবিকাশমান অগ্রাধিকার হিসাবে রয়ে গেছে। ভবিষ্যতের লক্ষ্য হল এমন সংযুক্ত ও জলবায়ু-সহনশীল বাঘের আবাসভূমি গড়ে তোলা, যা একইসঙ্গে বন্যপ্রাণী এবং মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করবে। তথ্যনির্ভর পর্যবেক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামনের সারির বনকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ এই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। অন্যান্য বাঘ-অধ্যুষিত দেশ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা জ্ঞান বিনিময়কে আরও সমৃদ্ধ করবে এবং যৌথ সংরক্ষণ প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী করবে। আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস প্রতি বছর নাগরিকদের, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে, এই দূরদর্শী সংরক্ষণ অভিযানে যুক্ত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ করে দেয়। সুদৃঢ় নীতিনির্ধারণ এবং ধারাবাহিক বাস্তবায়নের সমন্বয়ের মাধ্যমে ভারত বৈশ্বিক বাঘ সংরক্ষণে তার নেতৃত্বের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছে।



