সুমন আদক, হাওড়া : দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর অবশেষে বড়সড় স্বস্তির বার্তা বাকসাড়াবাসীর জন্য। রেল কর্তৃপক্ষের রিজনড অর্ডার অনুযায়ী, আগামী ২০২৭ সালের জুলাই মাসের মধ্যেই সম্পূর্ণ হয়ে যেতে পারে বাকসাড়া রেলওয়ে আন্ডারপাসের নির্মাণকাজ। অর্থাৎ, আর প্রায় ৯ মাসের সময়ের অপেক্ষা। আন্ডারপাস চালু হলে দীর্ঘদিনের রেলগেট-নির্ভর যাতায়াতের দুর্ভোগ থেকে অনেকটাই মুক্তি পাবেন এলাকার বাসিন্দারা। ইতিমধ্যেই আন্ডারপাস নির্মাণের প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। তবে বর্ষাকাল চলায় মূল নির্মাণকাজ, বিশেষ করে আন্ডারপাসের খননপর্ব, এখনও শুরু করা সম্ভব হয়নি। বর্ষা শেষ হলেই মূল কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে রেলের। নির্মাণকাজ চলাকালীন সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতেও একাধিক পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা এবং বিকেল ৪টে থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত যাতে রেলগেটে ইঞ্জিন দাঁড়িয়ে না থাকে এবং দ্রুত গেট খুলে দেওয়া যায়, সেই ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অ্যাম্বুলেন্স ও দমকলের মতো জরুরি পরিষেবার গাড়ি যাতে রেলগেটে আটকে না পড়ে তা নিশ্চিত করার উপরও জোর দেওয়া হয়েছে। রেলগেট সংলগ্ন এলাকায় যানজট নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ প্রশাসনকে বিশেষ বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। অর্থাৎ, আন্ডারপাস নির্মাণ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্তও যাতে বাকসাড়াবাসীকে অতিরিক্ত দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে না হয়, সেদিকেও নজর রাখছে প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরে বাকসাড়ায় রেলগেটের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আন্দোলনকারীদের দাবি, এই আন্দোলনের সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক যোগ নেই। এলাকার সাধারণ মানুষ একজোট হয়েই দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে এসেছেন। তাই আন্ডারপাস নির্মাণের সিদ্ধান্তকে তাঁরা নিজেদের সম্মিলিত আন্দোলনের জয় হিসেবেই দেখছেন।
আন্দোলনকারীদের কথায়, এই আন্ডারপাস শুধু বর্তমানের যাতায়াতের সমস্যা দূর করবে না, ভবিষ্যতে বাকসাড়া এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তন আনবে। এখন অপেক্ষা শুধু নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ হয়ে আন্ডারপাস চালু হওয়ার। প্রসঙ্গত, দক্ষিণ হাওড়ার বাকসাড়া অঞ্চলে রেলগেটের সমস্যা সমাধানের দাবিতে দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর রেলের তরফে গুরুত্বপূর্ণ আশ্বাস মিলেছে বলে দাবি আন্দোলনকারীদের। কলকাতা হাইকোর্টে দায়ের করা জনস্বার্থ মামলা (PIL)-এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ জুন এবং ১০ জুলাই রেলের সঙ্গে দু’দফা শুনানি হয়। সেই শুনানির পর রেলের পক্ষ থেকে একটি ‘রিজনড অর্ডার’ জারি করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, এই নির্দেশকে তাঁরা বাকসাড়াবাসীর আন্দোলনের জয় হিসেবেই দেখছেন।
এদিন আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে বিক্রম চ্যাটার্জি জানান, রেলের জারি করা নির্দেশে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, প্রায় জুন ২০২৭-এর মধ্যে রেলগেট সংক্রান্ত মূল কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সময়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ কমাতে রেলের তরফে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিক্রম চ্যাটার্জির দাবি, সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা এবং বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে যাতে রেলগেটে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ইঞ্জিন দাঁড়িয়ে না থাকে এবং দ্রুত গেট খোলা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এর ফলে ওই সময়ে সাধারণ মানুষকে যাতে কম সমস্যার মুখে পড়তে হয়, সেটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে দাবি আন্দোলনকারীদের। তৃতীয়ত, রেলগেট সংলগ্ন এলাকায় যানজট নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পুলিশ বাহিনী মোতায়েনের বিষয়েও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান বিক্রম চ্যাটার্জি। বিশেষ করে যানজটের কারণে অ্যাম্বুল্যান্স, দমকলের গাড়ি কিংবা অন্যান্য জরুরি পরিষেবার যানবাহন যাতে আটকে না পড়ে, তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, রেলের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি আন্দোলনকারীদের। বিক্রম চ্যাটার্জির কথায়, “বাকসাড়াবাসীর যে যন্ত্রণা, সেই কথাই আমরা শুনানির সময় বারবার তুলে ধরেছিলাম। অন্তর্বর্তী সময়ে কীভাবে তাঁদের কিছুটা রিলিফ দেওয়া যায়, সেটিও আমরা বলেছিলাম। রেল সেই বিষয়গুলি শুনেছে এবং এবার রিজনড অর্ডারে তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “খুব কম সময়ের মধ্যে বাকসাড়াবাসী একত্রিত হয়ে যে আন্দোলন গড়ে তুলেছেন এই রিজনড অর্ডার সেই আন্দোলনেরই জয়। জুন ২০২৭-এর মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা এবং তার আগে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে যে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, আমরা সেটিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছি।” আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, মূল কাজ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত রেলের এই অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাগুলি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা, সেদিকেও তাঁরা নজর রাখবেন। এই বিষয়ে বাকসাড়া অঞ্চলের বাসিন্দা তথা এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মুনিয়া ঘোষ বলেন, “আমাদের এই আন্দোলনের যে দীর্ঘ লড়াই, তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হল এই স্যাংশন লেটার এবং আদালতের নির্দেশ। বাকসাড়ার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে চারটি রেলগেটের কারণে যে অসহনীয় যন্ত্রণা ভোগ করে আসছেন, সেই যন্ত্রণাই আমাদের সবাইকে একজোট করেছে। চিকিৎসার জন্য বেরতে গেলে সমস্যা, জরুরি পরিষেবা পেতে সমস্যা—প্রতিদিনই আমরা এই দুর্ভোগের মধ্যে দিয়ে চলেছি। সেই কারণেই চারটি গেটের সমস্যা সমাধানের দাবিতে আমরা আন্দোলনে নেমেছিলাম এবং মহামান্য কলকাতা হাইকোর্টে পিআইএল করেছিলাম। বর্তমানে আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে বলতে পারি, দু’টি রেলগেটের মাঝের মধ্যবর্তী অংশ দিয়ে আন্ডারপাস তৈরির স্যাংশন লেটার আমরা হাতে পেয়েছি। রেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে যে সময়সীমা জানানো হয়েছে, সেই অনুযায়ী আনুমানিক ২০২৭ সালের জুন মাসের মধ্যে আমরা এই আন্ডারপাসের সুবিধা পেতে চলেছি। নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সময়ে জরুরি পরিষেবার যানবাহন যাতে যাতায়াত করতে পারে, সেই বিষয়েও রেল কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছেন। এই জয় শুধু কয়েকজন মানুষের জয় নয়, এটা সমগ্র বাকসাড়াবাসীর জয়। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই আমরা দীর্ঘদিনের এই সমস্যার ‘নাগপাশ’ থেকে মুক্ত হতে চলেছি। তাই আগামী দিনে বাকসাড়াবাসী একসঙ্গে এই সাফল্য উদযাপন করব। যে মানুষগুলি এতদিন চিকিৎসার জন্য যেতে পারেননি, ভালো চিকিৎসক বা জরুরি পরিষেবা পেতে সমস্যায় পড়েছেন, তাঁদের কাছে আমার আবেদন—আর কিছুদিন ধৈর্য ধরুন। আমরা খুব শিগগিরই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দিকে এগোচ্ছি। এই আন্দোলনে যাঁরা আমাদের পাশে ছিলেন, তাঁদের প্রত্যেককে অসংখ্য ধন্যবাদ। রেল কর্তৃপক্ষকেও ধন্যবাদ জানাই, কারণ শুনানির সময় তাঁরা আমাদের প্রতিটি সমস্যার কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনেছেন এবং তাঁদের রিজিউম অর্ডারে সেই সমস্যাগুলির কথাও লিখিতভাবে উল্লেখ করেছেন। যাঁরা আন্দোলনে সরাসরি আমাদের সঙ্গে ছিলেন এবং যাঁরা দূর থেকে আমাদের শুভকামনা জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিও আমরা কৃতজ্ঞ। সবশেষে সমস্ত সংবাদমাধ্যমকেও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। যেদিন আমরা প্রথম অবস্থান-বিক্ষোভে বসেছিলাম, সেদিনও আপনারা আমাদের পাশে ছিলেন। আর আদালতের নির্দেশের মাধ্যমে যখন আমরা এই গুরুত্বপূর্ণ জয় পেলাম, সেদিনও আপনারা আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। আশা করি, যেদিন আমরা নতুন আন্ডারপাস দিয়ে নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারব, সেদিনও আপনারা বাকসাড়াবাসীর এই আনন্দের মুহূর্তের সাক্ষী থাকবেন। আমার বাড়ি ও জন্মস্থান বাকসাড়াতেই। তাই এই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা ও লড়াই আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। আজকের এই সাফল্য আমাদের সকলের।”



