Tuesday, November 3, 2026
spot_img

গত কয়েকদিনের নিম্নচাপের মেঘে অন্ধকার বাগনানের কারিগরদের মুখে, শ্যামাপুজোর বাজার ধরতে হিমশিম বাজি প্রস্তুতকারকরা

সুমন আদক, হাওড়া: ক্যালেন্ডারের পাতায় শ্যামাপুজো যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে ব্যস্ততা। বাজির বাজারে এখন চাহিদা তুঙ্গে থাকার কথা। অথচ হাওড়ার বাগনানের আগুনশী এলাকার বাজি কারখানাগুলিতে ছবিটা সম্পূর্ণ উল্টো। সেখানে এখন ব্যস্ততার থেকেও বেশি দুশ্চিন্তা। কারণ, এই শিল্পের অন্যতম প্রধান ভরসা যে সূর্যের আলো, সেই রোদই যেন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। একের পর এক নিম্নচাপ, বৃষ্টি আর মেঘলা আকাশে থমকে যাচ্ছে বাজি তৈরির গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। চড়া রোদ না থাকায় তৈরি বাজি শুকোতে না পারায় জমছে কাজের চাপ, অন্যদিকে মাথায় হাত প্রস্তুতকারকদের। শ্যামাপুজোর আগে বিভিন্ন দোকানে বরাতের বাজি পৌঁছে দেওয়ার কথা থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরবরাহ করা যাবে কিনা, তা নিয়েই এখন ঘোর অনিশ্চয়তা। বাগনানের আগুনশী এলাকার বাজি শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু মানুষের জীবিকা। বছরের নির্দিষ্ট কয়েকটি মাসই তাঁদের কাছে উপার্জনের প্রধান সময়। এই সময়টুকুতে ভালো উৎপাদন ও বিক্রির উপর নির্ভর করে থাকে সারা বছরের রোজগারের হিসেব। কিন্তু প্রকৃতির খামখেয়ালিপনায় সেই হিসেবই এখন ওলটপালট হওয়ার আশঙ্কা। বাজি তৈরির পর নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পর্যাপ্ত রোদে শুকনো করা অত্যন্ত জরুরি। আর্দ্রতা থাকলে উৎপাদনের পরবর্তী প্রক্রিয়া ও সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়। ফলে শুধু উৎপাদন করলেই হচ্ছে না, আবহাওয়ার প্রতিকূলতায় আটকে যাচ্ছে তৈরি পণ্য বাজারজাত করার কাজও। আগুনশীর প্রলয় ফায়ার ওয়ার্কসের কর্ণধার গুরুদাস সাউয়ের কথায়, তাঁদের এই ব্যবসা চার দশকেরও বেশি পুরনো। সরকারি নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় শংসাপত্র নিয়েই তাঁরা বাজি তৈরি করেন। কিন্তু এবছর আবহাওয়ার পরিস্থিতি তাঁদের চিন্তা বাড়িয়েছে। একের পর এক নিম্নচাপের কারণে পর্যাপ্ত রোদ না মেলায় তৈরি বাজি শুকোতে দেরি হচ্ছে। সামনে শ্যামাপুজো, তার আগে বিভিন্ন দোকানে বাজি পৌঁছে দেওয়ার বরাত রয়েছে। কিন্তু আবহাওয়ার উন্নতি না হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেই সরবরাহ সম্পূর্ণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। শুধু আবহাওয়াই নয়, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিও বাড়তি চাপ তৈরি করছে। তার প্রভাব পড়তে পারে বাজারে বাজির দামের উপরেও। তবে বাগনানের বাজি শিল্পের সংকট শুধু আবহাওয়ার প্রতিকূলতায় সীমাবদ্ধ নয়। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত বৈধ প্রস্তুতকারকদের আরও একটি অভিযোগ রয়েছে। গুরুদাস সাউয়ের দাবি, একদিকে তাঁরা সমস্ত সরকারি বিধিনিষেধ মেনে ব্যবসা চালাচ্ছেন, অন্যদিকে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও শংসাপত্র ছাড়াই আড়ালে বাজি তৈরি করে বাজারে বিক্রি করছেন। এতে নিয়ম মেনে ব্যবসা করা প্রস্তুতকারকরা প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন। কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায়ও অনেক সময় বৈধ ব্যবসায়ীদের উপর এসে পড়ে। তাই বেআইনি বাজি উৎপাদন ও বিক্রি রুখতে প্রশাসনিক নজরদারি আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তিনি।
একই সুর শোনা যাচ্ছে বাজি কারিগরদের গলাতেও। কারিগর শ্রীকান্ত গায়েন জানান, বছরের মাত্র তিন মাস এই শিল্পে কাজের সুযোগ মেলে। সেই সীমিত সময়ের মধ্যেই উৎপাদন শেষ করে বরাতের মাল সরবরাহ করতে হয়। কিন্তু বারবার নিম্নচাপ ও বৃষ্টির কারণে কাজের ছন্দ ভেঙে যাচ্ছে। পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় শুকনোর কাজ পিছিয়ে পড়ছে। ফলে একদিকে যেমন উৎপাদনের সময়সীমা কমে আসছে, অন্যদিকে তেমনই নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করার চাপ বাড়ছে কারিগরদের উপর। আসলে বাগনানের এই বাজি শিল্পের কাছে রোদ শুধু আবহাওয়ার অনুকূল পরিস্থিতি নয়, রোজগারেরও অন্যতম শর্ত। আকাশে মেঘ জমলে তার প্রভাব পড়ে কারখানার কাজ থেকে শুরু করে কারিগরদের উপার্জন, ব্যবসায়ীদের বরাত এবং শেষ পর্যন্ত উৎসবের বাজারেও। শ্যামাপুজোর আগে তাই আকাশের দিকে তাকিয়ে দিন গুনছেন আগুনশীর বাজি প্রস্তুতকারক ও কারিগররা। তাঁদের প্রত্যাশা, ফিরুক ঝলমলে রোদ। কারণ, সেই রোদের উপরেই এখন নির্ভর করছে বাগনানের বাজি শিল্পের উৎসবের মরশুমের অনেকটা হিসেব।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

1,231FansLike
10FollowersFollow
4SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles