ওঙ্কার মিত্র : সময় ভোটের দড়ি ধরে যত টানছে ততই যেন কেন্দ্রীয় শাসনের ফাঁস আরও আরও শক্ত হয়ে চেপে বসছে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনে। এই সুযোগ অবশ্য করে দিচ্ছে বাংলার আইন শৃঙ্খলার অবনতি, অপরাধ প্রবণতা, দুর্নীতিবাজদের স্বাধীনতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা। বিধানসভার ভোট যত এগিয়ে আসছে ততই এই ধারণা দৃঢ় হচ্ছে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের। লাগামহীন দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, নারী নির্যাতন, ভোেট পরবর্তী হিংসা আগেই ডেকে নিয়ে এসেছে সিবিআই, ইডি ও এনআইএকে। কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্পে কাটমানি ও তাকে নিয়ে যথেচ্ছাচার সুযোগ বরাদ্দ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় এবার এসআইআরের মত একটি সাংবিধানিক সরকারি কাজের বিরোধিতার নামে করা চরম অসহযোগিতা ডেকে নিয়ে এল কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের শাসন ও কমিশনের রক্তচক্ষু। এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছছে যে বারবার আদালতে গিয়েও এই ফাঁস আলগা করা যাচ্ছে না। বরং আরও চেপে বসছে প্রশাসনের গলায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা ভোটের ঠিক আগে এই ফাঁস আরও শক্ত হয়ে দমবন্ধ অবস্থা তৈরি করবে।
অথচ কয়েকদিন আগেও আমরা বিরোধীদের সুরে সুর মিলিয়ে রাজনীতিবিদদের মুখে সেটিংয়ের গল্প শুনছিলাম। সংবিধানের ৩৫৬ বা ৩৫৫ ধারা লাগু করার সুযোগ থাকলেও কিভাবে কেন্দ্রের শাসক দল রাজ্যের শাসক দলকে প্রশ্রয় দিচ্ছে তার মুখরোচক কাহিনী রচিত হচ্ছিল। কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার গড়িমসিতে জনমনে প্রতিষ্ঠাও পাচ্ছিল এই সেটিং কাহিনী। কিন্তু এসব গেরো যে রাখা রয়েছে ভোট সময়ের জন্য তা সম্ভবত আঁচও করতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা।
আসলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে রাজ্য সরকারকে দুর্বল করার কৌশল এখন অতীত। কংগ্রেস আমলে এইসব ধারার যথেচ্ছ ব্যবহার প্রমাণ করেছে এতে বরং হিতে বিপরীত হয়। পশ্চিমবঙ্গেও এর বহু ব্যবহার অতীতে রাজনৈতিক অস্থিরতার কোনো সুরাহা করতে পারেনি। উল্টে কংগ্রেসকেই রাজ্য থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। আর এই রাষ্ট্রপতি শাসন জারির নেশা বাড়লে শেষ পর্যন্ত তা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা দেখিয়ে দিয়েছে জরুরী অবস্থার অন্ধকার দিনগুলো। ভারতের রাজনীতিতে সেই ট্রমা আজও কাটেনি। এখন রাজনীতিতে অন্য সময় চলছে। তাই মুখ্যমন্ত্রী গ্রেপ্তার হলেও গণতান্ত্রিক সরকার ফেলা হয় না দিল্লিতে। এই ফেডারল স্ট্রাকচারে আছে শুধু সময়ের অপেক্ষা। দুর্বলতার সুযোগ পেলেই আইনের সাঁড়াশি দিয়ে চেপে ধরে কাহিল করে দিতে হবে যাতে বঞ্চনার সলতেতে আগুন লাগে। ব্যাস, সংসদীয় গণতন্ত্রে এরপর যা করার ক্ষুব্ধ জনগণই করে দেবে। শুধু তাদের মত প্রকাশের সুষ্ঠ ব্যবস্থা করে দিতে হবে। ঠিক এই পর্যায়টাই এখন চলছে এই বাংলায়।
কূটনীতির এই পথ ধরে বিস্ফোরণ, ধারাবাহিক হিংসা, নানা দুর্নীতি ও পক্ষপাত দুষ্ট রাজ্য তদন্তের সুযোগে এনআইএ, সিবিআই এবং ইডি তদন্তের নামে এ রাজ্যের গোপন খুঁটিনাটি জানার অধিকার পেয়ে গেছে। সর্বক্ষণ নজরদারি করার ছাড়পত্রও মিলেছে ঘন ঘন আসা যাওয়ার সুযোগে। এই নিরীক্ষণ আরও গভীর হয়েছে নারী নির্যাতনের তদন্তগুলো হাতে এসে যাওয়ায়। এর বাইরে আরও একটা বড় সুযোগ এনে দিল বরাদ্দের নয়-ছয়। কেন্দ্রীয় প্রকল্পের হিসাবপত্র দেখতে রাজ্যে চলে এল কেন্দ্রীয় দল। জেনে গেল রাজ্যের অর্থনীতির হাল হকিকৎ। তথ্য বলল, কেন্দ্রীয় বরাদ্দ না পেলে এরাজ্যে বঞ্চনা বাড়বে, বাড়বে ক্ষোভ বিক্ষোভ যা সামাল দেওয়ার আর্থিক ক্ষমতা নেই এই সরকারের। কাটমানিখোরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিতেই পথ পরিষ্কার হল, কেন্দ্রীয় বরাদ্দ বন্ধ করে দিয়ে পঙ্গু করে দেওয়া হল রাজ্যকে। কিন্তু প্রকল্প বন্ধ করা যাবে না। না দিলে ভোট যাবে, দিলে ঋণ বাড়বে। এ এক শাঁখের করাত অবস্থা। জনপ্রিয়তা হারাতে শুরু করলো সরকার। ফর্মুলা ধরে এবার শুধু জনমত জানানোর ক্ষেত্রটা পরিষ্কার করে দিতে হবে। এসে গেল এসআইআর। চালু হল ভুয়ো ভোটার বাদ দিয়ে তালিকা শুদ্ধিকরণের কাজ। সেখানেও সুযোগ হারালো রাজ্য। যে কাজ ছিল রাজ্য প্রশাসনের কর্মীদের দখলে অসহযোগিতার ফলে সেটাই চলে গেল পর্যবেক্ষকদের নামে কেন্দ্রীয় কর্মীদের শাসনে। এখন গেল গেল রব তুলে আকাশ বাতাস কাঁপালেও কিছু হবে না।
বাকি ছিল রাজ্য অর্থনীতির আভ্যন্তরীণ মারপ্যাচ। তহবিলের এধার ওধার করে ঋণ নিয়ে চলছিল সামাল দেওয়া। বকেয়া ডিএ আদায়ের সুযোগে এবার সেটাতেও হাত বসাতে চলেছে সুপ্রীম কোর্ট গঠিত কমিটি। বিচারপতিদের ঘেরাটোপে রাজ্যের অর্থনীতির খুঁটিনাটি এবার খুলে যাবে দেশের অডিটর জেনারেলের সামনে। এতদিন চেয়ে চেয়ে রাজ্য সরকারের হিসাবের তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ করতো ক্যাগ। এবার সম্ভবত তাদের সেই আক্ষেপ মিটতে চলেছে। অর্থাৎ পুলিশ থেকে শুরু করে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তথ্যভান্ডার এখন কেন্দ্রীয় সরকারের দখলে যাবে।
আছা পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকার কেন্দ্রের মোদী সরকারের থেকে ৩ বছরের বড়। কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকারের আমলে তৃণমূল সরকারের জন্ম হলেও ঘর করতে হচ্ছে এমন একটা সরকারের সঙ্গে যাদের রাজনৈতিক মেধা ও ক্ষমতা কংগ্রেসের থেকে শতগুণ বেশি। যদিও নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে মমতা ব্যানার্জির সম্পর্ক ভালো বলেই সকলে জানতো। ফুল, মিষ্টি, পোশাক কি না বিনিময় হয়েছে তাঁদের মধ্যে। মোদীজিও প্রথম প্রথম দিদি ও মোদীর দুই লাড্ডুর কথা বলতেন। ভেবেছিলেন অটলজীর হাত ধরে বেড়ে ওঠা মমতা তাঁর বন্ধু হয়ে কাজ করবে। কিন্তু তিনি হয়তো বুঝতে পারেননি ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে মমতার কাছে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা অনেক বড়। তাই তিনি বার বার শিবির বদলেছেন, কাছের মানুষদের ত্যাগ করতে এতটুকু দ্বিধা করেননি। আবার যাকে দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক সুবিধা হবে তার ‘দুষ্টুমি’ মেনে নিয়েও পাশে থেকেছেন। ফলে লড়াই এখন অন্য মাত্রায় পৌঁছেছে। বকলমে কেন্দ্রীয় শাসনেই এবারে ভোটের লড়াই মরণপণ হবে তাতে সন্দেহ নেই। কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত রক্তক্ষয়ী হওয়ার সম্ভবনাও প্রবল। আর এই লড়াইতে হয়ত বলি হবো আরও কিছু বঙ্গবাসী। ভোটের আগে এহেন আতঙ্কই কুরে কুরে খাচ্ছেন বঙ্গবাসীকে।
