সৌরভ নস্কর গঙ্গাসাগর: সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অন্যতম পরিচিত ও ঐতিহাসিক স্থান সাগরদ্বীপ। সেই সাগরদ্বীপের বুকে গড়ে ওঠা ‘ধসপাড়া আদিকালী মন্দির’ কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং স্থানীয় মানুষের আবেগ, ঐতিহ্য ও বহু প্রাচীন স্মৃতির এক জীবন্ত দলিল। সময়ের সাথে সাথে বহু কিছুর পরিবর্তন হলেও, বয়সের ভারে এই পুজো ও মন্দিরের কৌলীন্য কিংবা জৌলুস বিন্দুমাত্র কমেনি; বরং প্রতি বছরই ভক্তদের উৎসাহ ও ভক্তি যেন কয়েক গুণ বেড়ে চলেছে। ঐতিহ্য আর বিশ্বাসের মেলবন্ধনে ঘেরা এই জাগ্রত মন্দিরটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাড়ে চারশো বছরের ইতিহাস ও রূপকথার মতো নানা জনশ্রুতি। ইতিহাসের পাতা উল্টালে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় গড়ে উঠেছিল একটি নির্জন দ্বীপ—যা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সাগরদ্বীপ নামে পরিচিত।
সে যুগে এই দ্বীপটি ছিল দুর্গম ও ঘন জঙ্গলে ঢাকা। চারদিকে ছেয়ে থাকা সেই জঙ্গলে ছিল সুন্দরবনের হিংস্র জীবজন্তুর মুক্ত বিচরণ ও আস্তানা। জীবন হাতে নিয়ে কাঠ ও মধু সংগ্রহ করতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ সেই দ্বীপে পা রাখত।বিপদসঙ্কুল জঙ্গলে পা রাখার আগে কাঠুরে ও মধু সংগ্রাহকরা হিংস্র পশুপাখির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় জঙ্গলঘেরা এক বিশাল বটগাছের তলায় মায়ের আরাধনা ও পুজো-অর্চনা শুরু করেছিলেন। কালের পরিক্রমায় সেই বটগাছের তলার পুজোই রূপ নেয় আজকের এই বিখ্যাত মন্দিরে। সাগরদ্বীপের তৎকালীন বিশিষ্ট বাসিন্দা ইন্দ্রনারায়ণ পাত্র স্বপ্নাদেশ পেয়ে বা ভক্তিভরে মায়ের এই সুনির্দিষ্ট স্থানটিকে পুজো-অর্চনার জন্য রূপরেখা দেন এবং সেখানে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। স্থানীয় মানুষের কাছে এই মন্দিরটি বর্তমানে ‘ধসপাড়া আদিকালী মন্দির’ নামে সমধিক পরিচিত। কথিত রয়েছে, বাংলা ১৩৩২ সালে ইন্দ্রনারায়ণবাবু এক বিশেষ অলৌকিক হুকুম পান যে এই পবিত্র ভূমিতেই মায়ের শিলা মূর্তি প্রকটিত বা উদ্ভূত হবে।সেই আদেশ অনুযায়ী পরবর্তীকালে সেখানে মায়ের একটি শিলা মূর্তি উদ্ধার হয়।প্রথমদিকে সেই উদ্ধার হওয়া অলৌকিক শিলা মূর্তিটিকে বটগাছের নিচে রেখেই জঙ্গলবাসী ও ভক্তেরা পুজো দিতেন। আজও স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে এই মন্দির নিয়ে নানা অবিশ্বাস্য গল্প শোনা যায়। অতীতে মন্দির প্রাঙ্গণ বা তার আশেপাশের জঙ্গলে বাঘ এবং বিষধর সাপের বিচরণ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। বহু মানুষ বাঘের প্রত্যক্ষ দর্শন পেয়েছেন এবং ভেজা মাটিতে বাঘের পায়ের ছাপ দেখেছেন। অনেকে আবার লোকমুখে এ-ও বলে থাকেন যে, মায়ের আদেশ অমান্য করে অন্যায় করলে বহুজনকে নাকি মায়ের অলৌকিক কোপ বা রোষানলে পড়তে হয়েছে। এই পুজোর শুরুর দিকের নিয়মকানুনও ছিল অত্যন্ত সাধারণ ও অনন্য। অতীতে এখানে ব্রাহ্মণের তেমন বসবাস ছিল না এবং পুজো দেওয়ার জন্য কোনো পুরোহিতের প্রয়োজন হতো না।নিয়ম ছিল—যে ভক্ত পুজো দিতে আসবেন, তিনি নিজ হাতেই মা-কে পুজো দিয়ে চলে যাবেন। কোনো সামাজিক ভেদাভেদ বা নিয়মকানুনের বাঁধন ছাড়া নিজের মনের যাবতীয় ব্যাকুলতা, আবেগ ও আকুতি ভক্তরা সরাসরি মায়ের চরণে জানাতেন। পরবর্তীতে লোকালয় বাড়ার সাথে সাথে যখন মানুষের জমায়েত বৃদ্ধি পায় এবং এলাকায় ব্রাহ্মণদের বসবাস শুরু হয়, তখন থেকে বৈদিক আচার-অনুষ্ঠান ও নিয়মনীতি মেনে শাস্ত্রীয় উপায়ে পূজার্চনার রূপ দেওয়া হয়। সেই ধারা অব্যাহত রেখে আজও এই মন্দিরে মা কালীর পূজা হয়ে আসছে। অতীতে মায়ের মন্দিরে পশুবলির প্রথা প্রচলিত থাকলেও, পরবর্তীতে জানা যায় মায়ের বিশেষ আদেশ বা নির্দেশের পরই সেই বলিরীতি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে পরম সাত্ত্বিক উপায়ে মায়ের পুজো করা হয়। যদিও বছরের প্রতিটি দিনই এই মন্দিরে নিত্যপুজোর ব্যবস্থা রয়েছে, তবে বিশেষ করে প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার পুণ্যার্থী মা কালীর দর্শন পেতে ও মানত পূরণ করতে এখানে ভিড় জমায়।গঙ্গা ও সাগরের এই সঙ্গমস্থলে অবস্থিত ধসপাড়া আদিকালী মন্দির আজ কেবল স্থানীয়দের নয়, দূর-দূরান্তের অজস্র মানুষের কাছে এক মহাপবিত্র তীর্থক্ষেত্র। বর্তমানে কালীপুজো প্রায় দোরগোড়ায়। হাতেগোনা আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি।কার্তিক মাসের অমাবস্যার সেই মহাসন্ধিক্ষণকে কেন্দ্র করে এখন ধসপাড়া আদিকালী মন্দির প্রাঙ্গণে চলছে কর্মব্যস্ততার চরম সময়। ঐতিহ্যবাহী এই প্রাচীন জরাজীর্ণ মন্দিরটির মেরামতি এবং সংস্কারের কাজ জোরকদমে চালানো হচ্ছে।তার পাশাপাশি চলছে পুজোর সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও শেষ মুহূর্তের অন্যান্য প্রশাসনিক ও মাঙ্গলিক প্রস্তুতি। আড়াইশো বছর আগের সেই জঙ্গলঘেরা বটতলার পুজো আজ বিরাট উৎসবে পরিণত হলেও, এর ঐতিহাসিক গন্ধ, ভয়-ভক্তির মেলবন্ধন এবং প্রতিমা ও পুজোর ভাবগাম্ভীর্য আজও অমলিন। সাড়ে চারশো বছরের পুরনো এই স্মৃতিবিজড়িত দ্বীপে আবার নতুন করে মাতোয়ারা হতে চলেছে ভক্তসমাজ।



