সুভাষ চন্দ্র দাশ, ক্যানিং : দেশভাগ হয়েছে, কাঁটাতার উঠেছে, কিন্তু যন্ত্রণার কোনও দেশ হয় না। আর চিকিৎসারও কোনও সীমান্ত হয় না। সেই কথাই আবার প্রমাণ করলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালের চিকিৎসকরা।
বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর থানার প্রত্যন্ত গ্রাম রমজান নগরের বাসিন্দা নীহার মিস্ত্রী। পেশায় দিনমজুর।প্রায় এক বছর আগে কাজ করতে গিয়ে পড়ে গিয়ে বাম কাঁধের হাড় ভেঙে যায়। অভাবের সংসারে যেটুকু সঞ্চয় ছিল, তাই দিয়ে সাতক্ষীরা থেকে খুলনা, একাধিক হাসপাতাল, একাধিক চিকিৎসক। কিন্তু হাড় আর জোড়া লাগেনি। ব্যথা কমেনি। বাম হাতটা প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে। কাজ বন্ধ। সংসার অচল।
হতাশা যখন গ্রাস করছে, তখনই খবর পান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে কম খরচে ভালো হাড়ের চিকিৎসা হয়। আর দেরি করেননি। বৈধ পাসপোর্ট নিয়ে ভিসা করে স্ত্রী চম্পা মিস্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে সোজা ক্যানিং।
বর্তমানে ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন নীহার। তাঁর চিকিৎসার দায়িত্বে রয়েছেন হাসপাতালের অস্থি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. কার্তিক নসিপুরী। প্রাথমিক পরীক্ষার পর চিকিৎসক জানিয়েছেন, পুরনো ফ্র্যাকচার, হাড় বেঁকে জুড়ে গেছে, অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
হাসপাতালের বেডে বসে নীহার বলেন, “আমি গরিব মানুষ। বাংলাদেশে অনেক টাকা খরচ করেছি, ভালো হইনি। শুনেছি এখানে ডাক্তারবাবুরা খুব ভালো। আমার কাছে বৈধ পাসপোর্ট আছে। আমি চিকিৎসা করাতে এসেছি। আপনারা আমাকে সুস্থ করে দিন।”
পাশে বসে স্ত্রী চম্পার চোখে জল। তিনি বলেন, “মানুষটা একবছর ধরে এক হাতে কষ্ট পাচ্ছে। কাজ করতে পারে না। আমরা দিন আনি দিন খাই। ডাক্তারবাবু বলেছেন সুস্থ করে তুলবেন আমার স্বামীকে। আমরা সরকারের কাছে, হাসপাতালের কাছে কৃতজ্ঞ।”
এ বিষয়ে ডা. কার্তিক নসিপুরি বলেন, “রোগী বাংলাদেশের নাগরিক হলেও তাঁর বৈধ নথি রয়েছে। আমাদের কাছে রোগীই প্রথম। মানুষ হিসেবে চিকিৎসা করা আমাদের ধর্ম। আমরা সরকারি পরিকাঠামোর মধ্যেই যতটা সম্ভব বিন্যা ব্যয়ে তাঁর চিকিৎসা ব্যবস্থা করছি। এবং নিশ্চিত,তিনি সুস্থ হয়েই বাংলাদেশে ফিরে যাবেন।”
ক্যানিং মহকুমা হাসপাতাল সুত্রের খবর, “মানবিকতার খাতিরে আমরা সব রোগীকেই পরিষেবা দিই। বৈধ কাগজপত্র থাকায় বাংলাদেশী নাগরিক কে চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ম মেনেই দেওয়া হয়েছে।”
উল্লেখ্য,এক সময় ক্যানিং ছিল সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার,আন্তর্জাতিকস্তরে এখন তা হয়ে উঠছে মানবতারও প্রবেশদ্বার। কাঁটাতারের ওপারের এক দিনমজুরের ভাঙা কাঁধ জোড়া লাগাতে যে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এপারের সরকারি হাসপাতাল, সেই ছবিই আজ সবচেয়ে বড় খবর। নীহার সুস্থ হয়ে আবার নিজের গ্রামে ফিরবেন, নিজের হাতে কাজ করবেন, এই অপেক্ষায় এখন দুই বাংলার মানুষ।



