সুভাষ চন্দ্র দাশ,ক্যানিং : বাদশাহ চন্দন সাহার ছেলে মধ্যযুগের পীর হজরত গাজী সৈয়দ মূবারক আলি শাহ(গাজীবাবা)ছিলেন দিল্লী নিবাসী।বেলে গ্রামের আদমপুরের জঙ্গলে তাঁর জন্ম। খুব ছোট্টবেলা থেকে তিনি ছিলেন সংসার বিমূখ।তাঁর দুটি পুত্র সন্তান জন্মেছিল। দুঃখী গাজী ও মেহের গাজী। আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়ার আশায় মুবারক সংসার ত্যাগ করে ঘুরতে ঘুরতে ঘুটিয়ারী শরীফের কাছে বিদ্যধরী নদীর তীরে নারায়ণপুর গ্রামে আশ্রয় নেন। “তারাহেদে” নামে একটি দিঘীর পাড়ে আস্তানা গাড়েন।
জানা যায় তৎকালীন জমিদার রামচন্দ্র চাটুর্জ্যে তাঁকে এলাকা থেকে বিতাড়িত করেছিলেন। পরে ধোয়াঘাটা গিয়ে হেলা খাঁ নামে অপর এক জমিদারের কাছে আশ্রয় নেন।এরই কাছাকাছি কুড়ালীর সাপুর গ্রামে একটি মরা শেওড়া গাছের তলায় নিয়মিত বসতেন তিনি। বেশ কয়েকদিন পর আশ্চর্য্যজনক ভাবে ঐ মরা শেওড়া জীবিত হয়ে গাছের পাতা,ফল ,ফুল ফোটায় স্থানীয় লোকজন তাঁকে শ্রদ্ধা করতে থাকেন।
সেই সময় রাজা মদন রায় এক গুরুতর সমস্যায় পড়েন এবং জেল খাটতে হবে নিশ্চিত জেনে বিমর্ষ হয়ে পড়েন।সে যাত্রায় ত্রাতার ভূমিকা পালন করে মূবারক তাঁকে বাঁচিয়ে ছিলেন। রাজা মদন রায় খুশি হয়ে তাঁকে ঘুটিয়ারী শরীফে ৪৫২ একর জমি পাট্টা দিয়েছিলেন।মূবারকের বড় ছেলে দুঃখী তাঁর খোঁজ করতে করতে ধোয়াঘাটায় গাজী বাবার সন্ধান পায়। বাবা কে কাছে পেয়ে ছেলে আনন্দিত হয়ে বাবার সাথে থাকতে শুরু করেন। ১৭০৭ সালে মহামারি মন্বন্তর হয়। সেই সময় অনাবৃষ্টির কারণে চাষ-আবাদ পুরো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।দুঃখী গ্রামবাসীরা মূবারক কে বলেন “বাবাজী এখনও বৃষ্টি হল না ছেলেপুলেরা কি খাবে?” তিনি ব্যথিত হয়ে ৭ ই আষাঢ় ঘুটিয়ারী শরীফে আড়াই কুপ(আড়াই কোদাল) একটি পুকুর খনন করেন এবং মক্কা শরীফের আল্লার কাছে বৃষ্টি প্রার্থনা করে একটি ঘরের মধ্যে দরজা বন্ধ করে ধ্যানে বসেন।সেই সময় ভক্তদের তিনি বলেছিলেন “যতদিন পর্যন্ত বৃষ্টি না হবে,ততদিন পর্যন্ত তাঁর ঘরের দরজা যেন কেউ না খোলেন।”
সেই সময় একদল পাঠান তাঁর হাজত নিয়ে ধ্যানমগ্ন ঘরের বন্ধ দরজার সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন পাহারায়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর মূবারকের কোনরুপ সাড়া না মেলায় অধৈর্য্য হয়ে তারা ঘরের দরজা ভেঙে ফেলেন।দেখা যায় ধ্যানমগ্ন অবস্থা মূবারক মারা গেছেন।সেই দিনটি ছিল ঐতিহাসিক ১৭ ই শ্রাবণ।তারপর ঐ দিনই আকাশ ভেঙে প্রচুর বৃষ্টি নামে।সেই থেকে গাজীবাবার মৃত্যু দিনটি কে বহুকাল ধরে “গাজী সাহেবের মেলা” নামেই পালিত হয়ে আসছে।৪৫২ একর জমির উপর গড়ে উঠেছে “গাজী বাবার মাজার”। ১৭ ই শ্রাবণ দিনটিতে ভক্তরা তাঁর আত্মার শান্তির জন্য আয়োজন করেন শ্রাদ্ধের।মেলা অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। মেলায় দেশ-বিদেশ সহ ভারত বর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১৭ ই শ্রাবণ দিনটিতে লক্ষাধিক ভক্তদের সমাগম হয়।এছাড়াও সাধারণ লোকজন মনঃষ্কামনা পূরণের জন্য পবিত্র ভাবে বাবার নিজ হাতে আড়াইকোপ কোদালে কাটা মাজার সংলগ্ন পুকুরে “মক্কা পুকুর” এ সিরনি ভাসিয়ে দিলে কিংবা লাল সুতো নিয়ে নিমগাছে বা মাজারে ঢিল বাঁধেন।
বহুকাল ধরে আজও সেই রীতি নিয়ম মেনেই চলে আসছে দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার ঘুটিয়ারী শরীফে ঐতিহাসিক “গাজী সাহেবের মেলা”।
অন্যদিকে অন্যান্য বছরের ন্যায় এবছর মেলায় ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষের জনসমাগম হয়েছিল।



