সুভাষ চন্দ্র দাশ, ক্যানিং : অন্ধ্রপ্রদেশ,গুজরাত, মহারাষ্ট্র, কেরল ও ছত্তিসগড় রাজ্যগুলির প্রতিষ্ঠা দিবস পালন করলেও ভুলে গিয়েছিল বাঙালী,পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠা দিবস পালিত হয় না খোদ পশ্চিমবঙ্গে।লজ্জার বিষয় পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠা দিবস কবে সেই দিনটিও ভুলে যেতে বসেছে বাঙালী জাতি।বর্তমানে রাজ্যে বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হতেই শুরু হল পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন। শনিবার সমগ্র রাজ্যের পাশাপাশি ক্যানিং মহকুমা জুড়ে সর্বত্র মহাসমারোহে পালিত হল পশ্চিমবঙ্গ দিবস।
উল্লেখ্য ১৯৪৬-৪৭ এ মুসলমান নেতৃত্ব সম্পূর্ণ বঙ্গের পাকিস্তানভূক্তি দাবী করলে রাজ্যের সকল জাতীয়তাবাদী মানুষ তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।তৎকালিন সময়ে ভারতকেশরী ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী’র ভাবনা ছিল – পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠা।তৎকালীন সময়ে বাংলার কংগ্রেস দল এবং আপামর বাঙালীও তাঁকে পূর্ণসমর্থন করেছিল।
ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বুঝেছিলেন যে,বাঙালি হিন্দুদের অনন্তকাল মুসলিম শাসনে থেকে জাতিগত বিলুপ্তি এড়াবার একমাত্র উপায় হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ নামক প্রদেশ গঠন করে তাকে ভারত রাষ্ট্রের অঙ্গীভূত করা।
১৯৪৭ সালের ৯ মার্চ ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় একটি বিস্তারিত দলিল প্রকাশ করে বুঝিয়েছিলেন যে,পশ্চিমবঙ্গ গঠনের দাবি কখনওই ঘৃণ্য পাকিস্তান দাবির সমর্থক নয়, বরং পাকিস্তানের কবল থেকে বাংলার খানিকটা ছিনিয়ে এনে বাঙালি হিন্দুর মুক্তচিন্তার পীঠস্থান গঠনের প্রচেষ্টা মাত্র।যেখানে পুরো বাংলাই মুসলিম সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের খপ্পরে চলে যেতে বসেছিল, সেখানে বাংলার হিন্দুদের অধিকার আছে তার হিন্দুপ্রধান অংশটা ছিনিয়ে নেবার।
২ মে ১৯৪৭ সালে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় লর্ড মাউন্টব্যাটেন কে একটি দীর্ঘ চিঠিতে লিখে জানিয়েছিলেন যে, তিনি পাকিস্তান প্রস্তাবের কট্টর বিরোধী এবং অখন্ড ভারতের পক্ষে। কিন্তু, যদি মুসলিম লীগের দাবির কাছে নতিস্বীকার করে ইসলামিক রাষ্ট্র পাকিস্তান গঠন করা হয়, তাহলে গোটা বাংলাকেই পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়ার পরিবর্তে হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গ কে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
১৯৪৭ সালের ২০শে জুন পশ্চিমবঙ্গ আইনসভার সদস্যরা ৫৮-২১ ভোটে বাঙালী হিন্দু হোমল্যান্ডের পক্ষে ও পাকিস্তানে যোগদানের বিপক্ষে ভোট দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ গঠন সুনিশ্চিত করেন।
তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ গঠনে পূর্ণ সমর্থন করে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ, ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, ভাষাবিদ ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, বিজ্ঞানী ডঃ মেঘনাদ সাহা, ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকার, ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার, নেতাজী সহযোগী ও কৃষক নেতা হেমন্ত সরকার প্রমুখ।
সেই সময় প্রবল জনমতের সাক্ষ্য দিয়েছিল অমৃতবাজার-যুগান্তর পত্রিকা গোষ্ঠী, আনন্দবাজার পত্রিকা, দৈনিক বসুমতি, Modern Review ও প্রবাসী গোষ্ঠী।
অমৃতবাজার পত্রিকার বিখ্যাত জনমত সমীক্ষায় দেখা যায় রাজ্যের ৯৮.৩% হিন্দু তাঁদের জন্য এক পৃথক রাজ্য চান। বুদ্ধিজীবি থেকে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ পশ্চিমবঙ্গের দাবীতে আন্দোলন করতে থাকেন।
ডঃ বাবা সাহেব আম্বেদকর, মতুয়া মহাসঙ্ঘের প্রধান প্রমথ রঞ্জন ঠাকুর এবং উত্তরবঙ্গের তপশীলি নেতা ও বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য প্রেমহরি বর্মন বাঙালি হিন্দুর বাসভূমি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গঠনের পক্ষে জোরালো সমর্থন করেছিলেন।
বঙ্গীয় আইনসভার কমিউনিষ্ট সদস্যরা সমগ্র বাংলার পাকিস্তানভুক্তির পক্ষে ও পশ্চিমবঙ্গ গঠনের বিপক্ষে ভোট দেন।
২০ জুনের দিন থেকে অমুসলমান আমলারা সুরাবর্দীর পরিবর্তে প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষকেই বঙ্গের প্রথম হিন্দু মূখ্যমন্ত্রী হিসেবে রিপোর্ট করতে শুরু করেন। জন্ম হয় পশ্চিমবঙ্গের।
বঙ্গের ইতিহাসে ১৯৪৭ এর ২০শে জুনই সর্বপ্রথম বাঙালি সমাজ একজন হিন্দু নেতৃত্বকে রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রী হিসেবে বরণ করে নেন।শুরু হয় পশ্চিমবঙ্গের পথচলা।
সেই ইতিহাসকে সাক্ষী রেখে বিজেপি নেতৃত্ব ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী’র মহান আত্মবলিদান দিবস উৎযাপন সমিতির একান্ত প্রচেষ্টায় শনিবার ক্যানিং মহকুমা জুড়ে পালিত হল হল ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী’র মহান আত্মবলিদান ও পশ্চিমবঙ্গ দিবস।
ক্যানিং মহকুমার বাসন্তী,গোসাবা,জীবনতলা ও ক্যানিংয়ের বিভিন্ন প্রান্তে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ডঃ শ্যামাপ্রসাস মূখার্জী প্রতিকৃতি তে মাল্যদান এবং প্রদীপ প্রজ্জোলনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।



