Tuesday, June 2, 2026
spot_img

সাপ নিয়ে সচেতনতার বার্তা

সুভাষ চন্দ্র দাশ,ক্যানিং : সাপ নাম শুনলেই সমস্ত মানবজাতির হৃদপিন্ড কেঁপে ওঠে। বিষধর সাপ কিংবা বিষহীন সাপ হোক না কেন।এছাড়া বিশেষ করে গ্রীষ্মকাল এবং বর্ষাকালে সাপের উপদ্রব কয়েকগুণ বেড়ে য়ায়। কামড়ের ঘটনা ঘটে অহরহ। তবে সঠিক চিকিৎসা পরিষেবা পেলে পুরোপুরি সুস্থ হওয়া সম্ভব। বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান উন্নত। তাস্বত্বেও প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। ফলে সাপে কামড় দিলে ওঝা-গুণীনের দ্বারস্থ হচ্ছেন। সেক্ষেত্রে মৃত্যু অবধারিত। এমত অবস্থায় সাপ নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে ময়দানে নেমেছেন বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। এছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা “হু” এক নির্দেশিকায় জানিয়েছে,আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সাপের কামড়ে মৃত্যুর হার অর্ধেকের নীচে নামিয়ে আনতে বদ্ধ পরিকর।সেই পর্বে শুরু হয়েছে কর্মপ্রণালী।এমত অবস্থায় প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ মানুষকে সাপ সম্পর্কিত সচেতনতা করতে অভিনব পন্থা অবলম্বন করে মাঠে নেমে পড়েছেন Human Environment Alliance League (HEAL) নামক এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা।সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রান্তে মুলতঃ বিষধর কালাচ,কেউটে,গোখরো,শঙ্খচূড়,গেছোবোড়া ও জলকেরুল সাপের উপদ্রব।এছাড়াও অন্যত্র রয়েছে চন্দ্রবোড়া সহ বিভিন্ন সামুদ্রিক সাপ। সাধারণ মানুষজন যাতে করে সহজেই সাপ চিনতে পারে এবং চিকিৎসা পরিষেবার জন্য যাতে  সরকারী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যায় সে বিষয়ে সচেতনতার উদ্যোগ গ্রহণ করলেন HEAL নামক সংস্থা।সুন্দরবনে ক্যানিং মহকুমা এলাকার বিভিন্ন রাস্তার পাশে সাপ সম্পর্কিত তথ্যের সাইবোর্ড বসানোর কাজ শুরু করেছে।সাইনবোর্ডে রয়েছে বিষধর ও বিষহীন সাপের ছবি। এছাড়াও রয়েছে,বন্যপ্রাণ আইন ১৯৭২ ধারা অনুযায়ী সাপ ধরা, মারা,কিংবা বিক্রিকরা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। শুধু অপরাধ নয়,অভিযুক্তের ৩-৭ বছর পর্যন্ত জেল ও ১ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। 

যাতায়াতের পথে সাইনবোর্ড চোখে পড়বেই। একটু চোখ বুলিয়ে নিলেই সাপ সম্পর্কিত ধারণা অনেকাংশ রপ্ত হবে।ফলে মৃত্যু কিংবা সাপ কামড়ে হাত থেকে সাধারণ মানুষ সচেতনতা লাভ করে সুরক্ষিত থাকতে পারবেন বলে বিশ্বাস স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার।

উল্লেখ্য,রাজ্যের দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলায় সাপের কামড়ের ঘটনা বেশী ঘটে এবং মৃত্যুর হারও সব থেকে বেশি।

এই জেলায় জল জঙ্গলে ভরা সুন্দরবন এলাকায় সাপে কামড়ানো ঘটনা বেশি ঘটে।প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং যোগাযোগের অসুবিধার কারণে কুসংস্কারের বেড়াজালে পড়ে এখানে সাপে কামড়ানো রোগীর প্রাণ সংশয় এর সম্মূখীন হতে হয়। আমাদের দেশে প্রায় ২৫০ প্রজাতির সাপ দেখতে পাওয়া যায়। এদের মধ্যে ৫২ প্রজাতির সাপ বিষধর।আবার এই ৫২ প্রজাতির মধ্যে ৪০ টি সামুদ্রিক সাপ।সুন্দরবন সহ রাজ্যে ৬ প্রজাতির বিষধর সাপ দেখতে পাওয়া যায়।এই ছয়টি সাপের মধ্যে ৪ টি সাপের কামড়ে বেশীর ভাগই মানুষের মৃত্যু হয়।

বিষধর সাপগুলো হল , কালাজ, শঙ্খচূড়, কেউটে, শাঁখামুটি, গোখরো, চন্দ্রবোড়া ,গেছোবোড়া এবং জলকেরুল।

বিষহীন সাপগুলো হল ,ঘরচিতি,কালনাগিনী, দাঁড়াশ, লাউডগা, তুতুর, লাল বালিবোড়া, বেতআছাড়, অজগর, জলঢোঁড়া,মেটেলি, জলমেটেলি। 

১) “কালাজ” —প্রচন্ড তীক্ষ্ণ বিষধর সাপ এটি।এর আঞ্চলিক নাম শিয়রচাঁদা বা ঘামচাটা।এদের কোন ফণা নেই।এরা লম্বা তিন থেকে চারফুট হয়ে থাকে।একমাত্র রাতেই বিছানায় উঠে এসে কামড় দেয়।কামড় দেওয়ার পর কোন দাগ থাকে না এবং রক্ত বের হয় না। এমন ঘটনা যা কিনা পৃথিবীতে বিরল!কামড়ের সময় মাত্র এক মিলিগ্রাম বিষ প্রয়োগ করে। এই সাপের কামড়ে প্রত্যন্ত সুন্দরবন এলাকায় বেশি মৃত্যু(৬২.৮%)। কালাজ এর বিষ স্নায়ুকেন্দ্র নষ্ট করে দেয়। এই সাপ ভয়াল ভয়ঙ্কর ও তীক্ষ্ণ বিষধর। এদের গায়ের রঙ কালো,তার উপর ডোরাকাটা সাদা দাগ।এদের কে রাতেই দেখতে পাওয়া যায়।

২)“শঙ্খচূড়” — এই সাপ লম্বায় প্রায় ১০-১২ ফুট হয়ে থাকে।এটি পৃথিবীর সবথেকে বড় ধরনের বিষধর সাপ।এই সাপ মাত্র ১২ মিলিগ্রাম বিষ প্রয়োগ করে।সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে এদের দেখতে পাওয়া যায়।সর্প বিশেষঞ্জদের মতে এই বৃহৎ বিষধর শঙ্খচূড় প্রজাতির সাপটি অবলুপ্তির পথে। 

৩)“গোখরো” — এটি ফণাধর বিষাক্ত সাপ। এটির কামড়ালে নার্ভ কে অচল করে দেয়। কামড়ের সময় মাত্র ১৫ মিলিগ্রাম বিষ প্রয়োগ করে।এই সাপের কামড়ে ক্ষতস্থানে প্রচন্ড ব্যাথা হয় এবং ক্রমাগত ক্ষতস্থান ফুলতে থাকে। এরা স্থানীয় এলাকায় ‘খরিশ কেউটে’ নামে বেশি পরিচিত। এদের ফণার পিছনে ইংরাজী ‘U’ আকৃতির চিহ্ন থাকে।

৪)“কেউট” —এটি ফণাধর বিষাক্ত সাপ।এদের ফণার পিছনে ‘পদ্ম চিহ্ন’ থাকে। এদের কে স্থানীয় ভাবে ‘কালকেউটে’ , ‘আলকেউট’ ,‘শামূখভাঙা’ নামে পরিচিত। এরা কামড়ানোর সময় মাত্র ১৫ মিলিগ্রাম বিষ প্রয়োগ করে। এরা সাধারণত লম্বা ৫-৬ ফুট হয়ে থাকে।এদের কে ক্ষেতখামার,মাঠে,বাগানে দেখতে পাওয়া যায়।

৫)“চন্দ্রবোড়া” —এই সাপের কামড়ে মানবদেহের রক্তকণিকা ধ্বংস করে দেয়।বাংলার একমাত্র হিমোটক্সিক সাপ।এই চন্দ্রবোড়ার কামড়ে সব থেকে বেশি প্রাণহানী ঘটেছে বাংলায়। এটি ফণাহীণ সাপ,এদের গায়ে চাকা চাকা চন্দন হলুদ রঙের দাগ থাকে। এরা কামড়ালে রক্ত তঞ্চনের গন্ডগোল হয়। চিকিৎসা করাতে দেরী হলে রোগীর কিডনি নষ্ট হতে থাকে। মুত্রের সাথে রক্ত এসে যায়।এরা সাধারণত ২-৩ ফুট লম্বা হয়। 

৬)“শাঁখামুটি” — এরা খুবই শান্ত প্রকৃতির হয়। সাধারণত মানুষ কিংবা জীবজন্তুকে এরা কামড়ায় না। এদের বিষ তীক্ষ্ণ। এদের চেহারা বেশ বড় হয়। গায়ের রঙ উজ্জ্বল হলুদ এবং কালোর উপর ব্যান্ড। 

৭)“গেছোবোড়া” —এদের স্থানীয় নাম ‘গেছো সাপ’ । বিশেষঞ্জদের মতে এদের বিষধর সাপের তালিকা রাখলেও এদের কামড়ে মৃত্যুর সম্ভাবনা নেই।এদের সাধারণত জঙ্গলে দেখা যায়।

বিষহীন সাপ —

১)ঘরচিতি ২) কালনাগিনী ৩)লাউডগা ৪)দাঁড়াশ ৫)অজগর ৬)লালবালিবোড়া ৭)তুতুর ৮)বেত আছাড় ৯)মেটেলি ১০)জল মেটেলি।

সাপে কামড়ানোর পর রোগীকে যে যে লক্ষণ দেখে বোঝা যায়—

১)রোগীর দুটি চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসা। 

২)ক্ষতস্থানে অসম্ভব জ্বালা-যন্ত্রণা হওয়া। 

৩)ক্ষতস্থানে দ্রুত ফুলে ওঠা। 

৪)গলা ব্যাথা কিংবা ঢোক গিলতে অসুবিধা হওয়া। ৫)শরীরের নানান স্থান থেকে রক্ত বের হওয়া। ৬)জিভ জড়িয়ে যাওয়া। ৭)ঝিমিয়ে পড়া। ৮)চোখে ঝাপসা দেখা।৯)রোগীকে সাহস যোগানো।১০)অহেতুক রোগীকে হাঁটা চলা না করানো।

প্রখর গরমে এবং বর্ষাকালে সাপের উপদ্রব বেড়েই চলেছে,তেমনই বেড়েই চলেছে ওঝা গুণীনদের দাপটও।সাপের উপদ্রব থেকে বাঁচার উপায় থাকলেও ওঝা গুণীনদের হাত থেকে বাঁচতে গেলে আগেই নিজেকে সচেতন করতে হবে । আর তা না হলে,বিষাক্ত সাপের থেকেও ওঝা-গুণীনের তীক্ষ্ণ বিষ জীবন সংশয় ডেকে আনবে । কেউ রদ করতে পারবে না। ফলে ওঝা গুণীন একেবারেই এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।আর সাপের উপদ্রব থেকে বাঁচতে গেলে প্রথমত গৃহস্থের বাড়ীর চারপাশের এলাকা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।পাশাপাশি গুঁড়ো চুনের সাথে ব্লিচিং পাউডার মিশিয়ে গৃহস্থের বাড়ীর চারপাশে ছড়িয়ে দিতে হবে। সপ্তাহে কমপক্ষে তিন দিন এমন দিলেই ভালো ফল পাওয়া যাবে।তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ বিষাক্ত সাপ সহ অন্যান্য কীটপতঙ্গ গৃহস্থের বাড়ীর আশে পাশে আসতে পারবে না।

রাতের বেলায় অবশ্যই টর্চ লাইট ব্যবহার করে পথে হাঁটাচলা করা উচিৎ। রাতে ঘুমানোর আগে বিছানা ঝেড়ে পরিষ্কার করেই অবশ্যই মুসারী টাঙানো প্রয়োজন। 

সাপে কামড় দিলে কি করবেন —

একদমই ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। সাপ কামড়ালেই ঝাড়-ফুঁক ওঝা-গুণীনের কাছে একদমই যাওয়ারও প্রয়োজন নেই। সোজা নিকটবর্তী সরকারী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান।সাপ কামড়ালে ১০০ শতাংশ বাঁচা সম্ভব। মনে রাখা অত্যন্ত জরুরী,সাপে কামড়ালে চিকিৎসা ক্ষেত্রে “রুল অফ ১০০” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে কোন প্রজাতির বিষধর সাপ কামড় দিলে ১০০ মিনিটের মধ্যে ১০০ ‘AVS’(অ্যান্টি ভেরাম সিরাম)দিতে পারলেই রোগীর কোন মৃত্যুর সম্ভবনা থাকে না।সেই ক্ষেত্রে অহেতুক সময় নষ্ট না করে নিকটবর্তী স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরী এবং প্রাথমিক ভাবে সেটাই হবে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

উল্লেখ্য এশিয়া মহাদেশ তথা পৃথিবীর বিখ্যাত তীক্ষ্ণ বিষধর ফণাহীন সাপ হল “কালাজ”। এই কালাজ সাপ কামড় দিলে ক্ষতস্থান ফোলা,জ্বালা,যন্ত্রণা,ব্যাথা কোন কিছুই অনুভব করা যায় না।ক্ষতস্থানে কোনপ্রকার কোনরুপ চিহ্ন বা দাগ থাকে না।উপসর্গ হিসাবে পেট ব্যথা,শরীরের গাঁটে গাঁটে ব্যথা,খিচুঁনী ভাব এবং দুচোখের পাতা পড়ে আসাই কালাজ সাপ কামড়ের একমাত্র উপলক্ষণ। 

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

1,231FansLike
10FollowersFollow
4SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles