বিশাল দাস, বীরভূম : একসময় রাজ্য রাজনীতির অন্যতম শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বীরভূমে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে চিত্র অনেকটাই বদলে গেল। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের দাপট থাকা এই জেলায় এবার গেরুয়া ঝড়ে কার্যত চাপে পড়তে হল শাসক দলকে। জেলার ১১টি আসনের মধ্যে ৬টিতে এগিয়ে থেকে বড়সড় সাফল্য পেয়েছে বিজেপি, যেখানে আগের নির্বাচনে অধিকাংশ আসনই ছিল তৃণমূলের দখলে।
বীরভূমে তৃণমূলের উত্থানের পিছনে অন্যতম মুখ ছিলেন অনুব্রত মণ্ডল, যিনি ‘কেষ্ট’ নামেই বেশি পরিচিত। তাঁর নেতৃত্বেই বামফ্রন্টের শক্ত ঘাঁটি ভেঙে তৃণমূলের সংগঠন শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। তবে সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে। অনুব্রতর অনুপস্থিতির সময়ে সংগঠন ধরে রাখার দায়িত্বে উঠে আসেন কাজল শেখ। তবুও এবারের নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট করে দিয়েছে, জেলায় তৃণমূলের প্রভাব আগের মতো অটুট নেই।
প্রসঙ্গত, অনুব্রত মণ্ডলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বোলপুরেও এবারে মিশ্র ফলাফল সামনে এসেছে। এখান থেকেই দলীয় কোর কমিটির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে অতীতে। ভোট গণনার দিন সকালে বোলপুরের দলীয় কার্যালয়ে উপস্থিত থেকে ফলাফলের দিকে নজর রাখেন অনুব্রত। বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রের ব্লক ও অঞ্চল নেতৃত্বদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগও রাখেন তিনি। প্রথমদিকে কার্যালয়ে কর্মী-সমর্থকদের ভিড় লক্ষ্য করা গেলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কমতে থাকে। দিনের শেষে কার্যত নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে কার্যালয়, যা অন্য নির্বাচনের সময়ের চিত্রের সঙ্গে স্পষ্টতই ভিন্ন।
অন্যদিকে, জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। বীরভূমের মতো জেলায় আগে কখনও এত আসনে বিজেপির সাফল্য না মিললেও এবারে রাস্তায় নেমে গেরুয়া আবিরে উৎসব করতে দেখা যায় তাদের। কোথাও বাজনা, কোথাও স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পরিবেশ।
ফলাফলে দেখা গিয়েছে, বিজেপি ৬টি আসন দখল করেছে এবং তৃণমূল পেয়েছে ৫টি। রামপুরহাট, লাভপুর, সাঁইথিয়া ও সিউড়ির মতো আসনগুলোতে জয়ের বিষয়ে আশাবাদী ছিল তৃণমূল শিবির, কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বিশেষ করে বোলপুর শহরে আশানুরূপ লিড না পাওয়ায় আরও হতাশা তৈরি হয়েছে দলীয় নেতৃত্বের মধ্যে। যদিও বোলপুর বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী চন্দ্রনাথ সিংহ জয়লাভ করেছেন, তবুও অধিকাংশ ওয়ার্ডে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে সংগঠনের ভিত নিয়ে।
চন্দ্রনাথ সিংহ বলেন, “মানুষের সঙ্গে থেকে কাজ করেছি বলেই জয় এসেছে। তবে কিছু জায়গায় গাফিলতি ছিল, তা খতিয়ে দেখা হবে। শহরের ভোট আরও ভালো হবে বলে আশা ছিল, কিন্তু তা হয়নি। কোথায় পিছিয়ে পড়েছি, তা বিশ্লেষণ করা হবে।”
দলীয় সূত্রে খবর, এত উন্নয়নমূলক কাজের পরেও এই ফলাফল আশানুরূপ নয় বলে মনে করছে তৃণমূলের একাংশ। একইসঙ্গে রাজ্যের অন্যান্য জেলাতেও দলের একাধিক পরিচিত মুখের পরাজয় নেতৃত্বকে ভাবাচ্ছে।
যদিও চূড়ান্ত ফল ঘোষণার আগে প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করতে চাননি অনুব্রত মণ্ডল। সন্ধ্যায় সংবাদমাধ্যমের সামনে বক্তব্য রাখার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি কোনও মন্তব্য না করেই বাড়ি ফিরে যান।
সব মিলিয়ে, একসময় তৃণমূলের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বীরভূমে এবারের ফলাফল স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—জেলার রাজনৈতিক জমিতে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু






