সৌরভ নস্কর, গঙ্গাসাগর : ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণভেরি বাজতেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনৈতিক পারদ এখন তুঙ্গে। সাগর বিধানসভা কেন্দ্রে ফের তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়েই সরাসরি বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন বর্তমান সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী তথা বর্ষীয়ান রাজনীতিক বঙ্কিমচন্দ্র হাজরা। বৃহস্পতিবার রুদ্রনগর জনসংযোগ কার্যালয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন, “সাগরের মাটিতে বিজেপি প্রার্থী সুমন্ত বাবুকে ৩০ থেকে ৪০ হাজার ভোটের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করবে তৃণমূল।”
এদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বঙ্কিমবাবু তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইতিহাস তুলে ধরেন। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই তিনি দলের একজন একনিষ্ঠ সৈনিক। তাঁর কথায়, “আমি কখনও পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য, কখনও গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য, আবার কখনও প্রধান হিসেবে নিচুতলা থেকে কাজ করেছি। ২০০১ সালে বাম আমলের চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও তৃণমূলের ঝাণ্ডা নিয়ে সাগরের লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলাম।” রাজনীতির পাশাপাশি তাঁর শিক্ষাগত ও পেশাগত জীবনের কথাও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। কলকাতা কলেজ থেকে এম.এ এবং শান্তিনিকেতন থেকে বি.এড সম্পন্ন করে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, “শিক্ষকতা আমি অত্যন্ত দায়িত্ব নিয়ে করেছি। একদিকে যেমন ছাত্রদের ভবিষ্যৎ গড়েছি, অন্যদিকে রাজনীতি ও সমাজসেবার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের পাশে থেকেছি।” দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসায় সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট তিনি ব্যক্তিগতভাবে উপলব্ধি করেন বলেই দাবি করেন এই লড়াকু নেতা। ২০০৬ সালে বিধায়ক থাকাকালীন বামফ্রন্ট সরকারের অসহযোগিতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “তখনকার সরকার গ্রামীণ রাস্তাঘাট, পানীয় জল ও নদী বাঁধের কাজে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করত। ২০১১ সালে ‘ বদলা নয়, বদল চাই’ স্লোগানকে সামনে রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পর সাগরের প্রকৃত উন্নয়ন শুরু হয়।” তিনি আরও জানান, তাঁর দীর্ঘদিনের দাবিতেই মুখ্যমন্ত্রী বকখালি ডেভেলপমেন্ট অথোরিটি গঠন করেন এবং মন্ত্রী হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত তিনি সেই সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে উন্নয়নের কাজ পরিচালনা করেছেন।এদিন সংবাদমাধ্যমের সামনে উন্নয়নের একাধিক মাইলফলক তুলে ধরেন বঙ্কিমচন্দ্র হাজরা:
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে লড়াই করে হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদীর ওপর বিশাল সেতু নির্মাণ করেছেন, যা একসময় সিপিএম নেতারা বিরোধিতা করেছিলেন। এছাড়াও প্রায় ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নামখানায় তৈরি করা হয়েছে একটি সেতু, যার ফলে উত্তর চন্দনপিড়ী থেকে দক্ষিণ চন্দনগর পর্যন্ত সাধারণ মানুষের যাতায়াতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। সাগরের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ‘মুড়িগঙ্গা নদীর ওপর গঙ্গাসাগর সেতু’ নিয়ে তিনি সুখবর দেন যে, দফায় দফায় বৈঠকের পর বর্তমানে নদীতে সয়েল টেস্ট বা মাটি পরীক্ষার কাজ প্রায় শেষের মুখে এবং খুব শীঘ্রই এই সেতুর নির্মাণ কাজ পুরোদমে শুরু হতে চলেছে। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এ.পি.জে আব্দুল কালামের উক্তি টেনে বিজেপিকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, “স্বপ্ন দেখা ভালো, কিন্তু যে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয় না, সেই অবাস্তব স্বপ্ন দেখে লাভ নেই। আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার নিরিখে দায়িত্ব নিয়ে বলছি, বিজেপির এখানে কোনও অস্তিত্ব থাকবে না।” চারবারের বিধায়ক এবং বর্তমানে সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রীর এই আত্মবিশ্বাস সাগরের রাজনৈতিক সমীকরণকে যে আরও স্পষ্ট করে দিল, তা বলাই বাহুল্য। এখন দেখার, ২০২৬-এর ব্যালট বাক্সে উন্নয়নের এই খতিয়ান কতটা প্রতিফলন ঘটায়।
