রেলওয়ে প্রাঙ্গণে পরিচ্ছন্নতা কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়—এটি জনস্বাস্থ্য, যাত্রী সুরক্ষা, কার্যক্রমের দক্ষতা এবং জাতীয় গৌরবের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রেলস্টেশন ও ট্রেন প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ যাত্রীর ব্যবহৃত জনপরিসর। এই স্থানগুলিকে পরিচ্ছন্ন রাখা একটি সমষ্টিগত দায়িত্ব, যার জন্য প্রত্যেক নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নাগরিক শৃঙ্খলা প্রয়োজন।
রেলওয়ে প্রাঙ্গণের পবিত্রতা রক্ষা এবং নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও মনোরম ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে পূর্ব রেলওয়ে, ভারতীয় রেলওয়ে (রেলওয়ে প্রাঙ্গণে পরিচ্ছন্নতা বিঘ্নিতকারী কার্যকলাপের জন্য শাস্তি) বিধি, ২০১২ (বিধি ৭৬) এবং Railways Act, 1989-এর ধারা ১৪৫ অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। উক্ত বিধান অনুযায়ী রেলস্টেশন বা ট্রেনের ভেতরে ময়লা ফেলা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
“আবর্জনা ছড়ানো” (Littering) বলতে কোনো কঠিন বা তরল বর্জ্য পদার্থ এমন কোনো স্থানে রাখা, ফেলা বা পরিত্যাগ করাকে বোঝায়, যেখান থেকে সেই বর্জ্য নিচে পড়ে যেতে পারে, বাতাসে উড়তে পারে, জলে ধুয়ে যেতে পারে, আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে যেতে পারে বা অন্য কোনোভাবে রেল প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর মধ্যে প্ল্যাটফর্ম, রেললাইন, সিঁড়ি, চলাচলের এলাকা, ওয়েটিং হল, ট্রেন বা অন্য কোনো রেল সম্পত্তিতে আবর্জনা ফেলে রাখা অন্তর্ভুক্ত, যা পরে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এমনকি যদি বর্জ্যটি তাৎক্ষণিকভাবে ছড়িয়ে নাও পড়ে, তবে এর চলাচলের বা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি করে এমন যেকোনো কাজকেই ‘আবর্জনা ছড়ানো’ হিসেবে গণ্য করা হবে।
এই ধরণের কর্মকাণ্ড অস্বাস্থ্যকর এবং সম্ভাব্য অনিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে, যা জনস্বাস্থ্য, যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য এবং রেলের স্বাভাবিক কাজকর্মের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড রেলওয়ে প্রাঙ্গণকে অস্বাস্থ্যকর, অপরিচ্ছন্ন ও সম্ভাব্যভাবে অনিরাপদ করে তোলে, যা জনস্বাস্থ্য, যাত্রীসুবিধা এবং রেল চলাচলের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায়।
নিষিদ্ধ কার্যকলাপ
যেসব ব্যক্তি অনুমোদনহীন স্থানে ময়লা ফেলা, থুতু ফেলা, প্রস্রাব বা পায়খানা করা, স্নান করা, রান্না করা, পশু বা পাখিকে খাবার দেওয়া, বাসন বা কাপড় ধোয়া, যানবাহন মেরামত বা ধোয়া, অনুমতি ছাড়া মালপত্র সংরক্ষণ, পোস্টার লাগানো, রেল সম্পত্তিতে লেখা বা আঁকাআঁকি করা কিংবা রেল সম্পত্তি বিকৃত করার মতো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড ও হতে পারে।
রেলওয়ে প্রাঙ্গণে নিম্নলিখিত কার্যকলাপ কঠোরভাবে নিষিদ্ধঃ
নির্দিষ্ট ডাস্টবিন ছাড়া রেলওয়ে প্রাঙ্গণ বা বগিতে ময়লা ফেলা।
নির্দিষ্ট সুবিধা ব্যতীত রান্না, স্নান, থুতু ফেলা, প্রস্রাব, পায়খানা, পশু-পাখিকে খাবার দেওয়া, বাসন বা কাপড় ধোয়া, যানবাহন মেরামত বা ধোয়া, অথবা মালপত্র সংরক্ষণ।
আইনানুগ অনুমতি ছাড়া বগি বা রেলওয়ে প্রাঙ্গণে পোস্টার লাগানো, লেখা, আঁকাআঁকি বা কোনো কিছু প্রদর্শন।
রেল সম্পত্তি বিকৃত, ক্ষতিগ্রস্ত বা অপব্যবহার করা।
অনুমোদিত বিক্রেতা এবং হকারদেরও নিজস্ব কাজের ফলে উৎপন্ন বর্জ্য সংগ্রহের জন্য পর্যাপ্ত ডাস্টবিন বা কন্টেইনার রাখা এবং সেই বর্জ্যের বৈজ্ঞানিক উপায়ে সময়মতো নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
পূর্ব রেলওয়ে সকল যাত্রী, বিক্রেতা, কর্মী ও দর্শনার্থীদের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে আন্তরিক সহযোগিতার আহ্বান জানায়। যাত্রীসুবিধার জন্য স্টেশন ও ট্রেনের ভিতরে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন রাখা হয়েছে। সকলকে দায়িত্বশীলভাবে এগুলি ব্যবহার করার এবং অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস নিরুৎসাহিত করার অনুরোধ করা হচ্ছে। ছোট ছোট পদক্ষেপ—যেমন ডাস্টবিন না পাওয়া পর্যন্ত ব্যক্তিগত বর্জ্য নিজের কাছে রাখা বা সহযাত্রীকে ময়লা না ফেলতে অনুরোধ করা—সমষ্টিগতভাবে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
পরিচ্ছন্ন পরিবেশ রোগের বিস্তার রোধ করে, অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমায়, রেল সম্পত্তি সুরক্ষিত রাখে এবং ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করে। একটি পরিষ্কার স্টেশন সমগ্র সমাজের নাগরিক সচেতনতা ও শৃঙ্খলার প্রতিফলন।
রেল সম্পত্তি জাতীয় সম্পত্তি। এর সুরক্ষা ও পরিচ্ছন্নতা কেবল রেলওয়ের নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব, যিনি এর পরিষেবা গ্রহণ করেন। আসুন, আমরা সকলে মিলে প্রতিটি রেলস্টেশন ও প্রতিটি ট্রেনযাত্রাকে পরিষ্কার, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ করে তুলি।



