Home Uncategorized সুন্দরবনের ব্যাঘ্রবিধবা জীবন্ত দুর্গাদের পায়ে অর্ঘ্য প্রদান

সুন্দরবনের ব্যাঘ্রবিধবা জীবন্ত দুর্গাদের পায়ে অর্ঘ্য প্রদান

0

সুভাষ চন্দ্র দাশ,বাসন্তী: দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার প্রত্যন্ত সুন্দরবনে বাসন্তী ব্লকের শিবগঞ্জে চম্পা মহিলা সোসাইটি। সেখানে শনিবার এক অনন্য ভাবে ব্যাঘ্রবিধবা মায়েদের নিয়ে জীবন্ত দূর্গা রুপে তাঁদের পায়ে অর্ঘ্য নিবেদন করলেন সমাজসেবী তথা প্রাক্তন শিক্ষক অমল নায়েক। যা সুন্দরবনের বুকে এক অনন্য দৃষ্টান্ত এবং বিরল ইতিহাসও বটে।

এলাকার প্রায় ৪০০ ব্যাঘ্র বিধবা মা উপস্থিত ছিলেন এদিন অনুষ্ঠানে। এছাড়াও অসংখ্য মৌলে ও মৎস্যজীবী পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন। তাঁদের হাতে তুলে দিলেন নতুন বস্ত্র,পুজোর খরচ ও প্রায় ১৫ দিনের খাদ্যসামগ্রী। উল্লেখ্য অনবরত নিজের আবহে বয়ে চলেছে সুন্দরবনের বিদ্যাধরী,মাতলা,গোমর,হেড়োভাঙা,পিয়ালি নদী। একদিকে সুন্দরবনের গহীন জঙ্গল পীরখালি,সূধন্যখালি,মরিচঝাঁপি,সজনেখালি,যেখানে সর্বক্ষণ সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গলের বিচরণ ক্ষেত্র এবং আনাগোনা। ঠিক তার বিপরীত দিকে অসংখ্য গ্রাম।জীবন জীবীকার তাগিদে পরিবারের সকলের মুখে দুমুঠো অন্নতুলে দেওয়ার সন্ধানে প্রতিনিয়ত ওই সমস্ত গ্রামের মৎস্যজীবীরা সুন্দরবনের গহীণ অরণ্য জঙ্গলের নদীখাঁড়িতে পাড়ী দেয় মাছ,কাঁকড়া,কাঠ এবং মধু সংগ্রহের জন্য।

অনেকে হাসি মুখে ফিরতেন। অনেকেই আবার বাঘের আক্রমণে পড়ে চিরতরে হারিয়ে যেতেন। পরিবারে একমাত্র উপার্জনকারীর এমন করুণ পরিনতিতে অসহায় হয়ে পড়ে সেই সমস্ত দরিদ্র পরিবার।সুন্দরবনের বিভিন্ন গ্রামে এমন পরিবারের সংখ্যা প্রায় চারশো’র অধিক।  

শারদীয়ার আনন্দে সকলে যখন আনন্দঘন মুহূর্তে মেতে ওঠেন,বাঙালীর বৃহত্তম উৎসব শারদীয়ার তাৎপর্য্য কি? সেই অনুভুতি নেই এই সমস্ত ব্যাঘ্র বিধবা অসহায় দরিদ্র পরিবার গুলির কাছে।এছাড়াও কোন গুরুত্ব নেই অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটানো পরিবার ব্যাঘ্র বিধবা পরিবারের সদস্যদের। 

যদিও প্রত্যন্ত সুন্দরবনের জঙ্গলের উপর  নির্ভর করে বেঁচে থাকা গোসাবা,বালি,আমলামেথি,মথুরাখন্ড,সত্যনারায়ণপুর,কুমীরমারী,ঝড়খালি,লাহিড়ীপুর,সাতজেলিয়া,কালিদাসপুর,ঝড়খালি,ত্রিদীব নগর,একেজি কলোনির মানুষজন প্রতিনিয়ত জীবন সংগ্রাম লড়াই চালিয়ে কিভাবে বেঁচে রয়েছে, তা নিজের চোখে উপলব্ধি করেছেন বিশিষ্ট সমাজসেবী তথা বাসন্তী হাইস্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক অমল নায়েক।আর সেই কারণে তাঁদের দুঃখ দুর্দশার করুণ মর্ম বেদনায় অংশীদার হয়ে বাঘ কিংবা কুমীরের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে নিহত পরিবারগুলির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন প্রতিনিয়ত। এযাবৎ প্রায় ৩০০ মহিলা কে বিভিন্ন কর্মসংস্থানের মধ্যদিয়ে স্বনির্ভর করার প্রায়াস চালিয়ে যাচ্ছেন অমল নায়েক। পাশাপাশি প্রায় শতাধিক শিশুর পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়ে কর্মযঞ্জ চালিয়ে যাচ্ছেন।এমন বিশাল দায়িত্বপূর্ণ কর্মযঞ্জের দীর্ঘ প্রসার করতে কলকাতার বেশকিছু বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে ২০১৪ সালে গঠন করেন “সেভ্ টাইগার অ্যাফেক্টেড ফ্যামিলি(ষ্টাফ)”।চলতি বছর শারদীয়ার আগমনের আগেই সমগ্র সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রান্তের এই সমস্ত দুঃস্থ ব্যাঘ্র বিধবা পরিবার গুলোর হাতে তুলে দিলেন নতুন বস্ত্র,পুজোর খরচ ও খাদ্যসামগ্রী। 

ব্যাঘ্রবিধবা মা ললিতা মন্ডল,দুর্গামণি দাস,বন্যা, রাধিকা,বনলতা’রা পুজো উপহার পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে।

অমল নায়েক জানিয়েছেন, ‘ব্যাঘ্র বিধবা মায়েদের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে দীর্ঘ প্রায় দুদশক ধরে এমন কাজ করে চলেছি।ব্যাঘ্র বিধবা মায়েরা আমার কাছে জীবন্ত দুর্গা। এদিন শারদীয়া পুজো উপলক্ষ্যে তাঁদের চরণে অর্ঘ্য নিবেদন করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে হয়েছে। পাশাপাশি জঙ্গল নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছি। তবে এমনটা একক ভাবে সম্ভব নয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের বিশিষ্টদের এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে সুন্দরবনের বুকে যে কান্না,বেদনা, হাহাকার রয়েছে সেটা ঘুঁচবে। ব্যাঘ্র বিধবা কথাটি বিলুপ্ত হবে।সুন্দরবনের বুকে গড়ে উঠবে নিরাপদ পরিবেশ।’

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Exit mobile version