দেবাশিস রায়, পূর্ব বর্ধমান: আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ আবহে আতঙ্কিত মধ্যপ্রাচ্য সহ একাধিক দেশ।সেই আতঙ্কের ধাক্কায় বেসামাল হয়ে পড়লেন বঙ্গের প্রত্যন্ত এলাকার এক বৃদ্ধ পিতা।এইমূহূর্তে ‘অশান্ত’ ইরানে কর্মরত পুত্র্।উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সে এখনি নিজের বাড়িতে ফিরতে পারছে না।সেই দুঃশ্চিন্তায় অসুস্থ বৃদ্ধের কার্যত প্রাণ সংশয় দেখা দিল।চিকিৎসার জন্য তড়িঘড়ি হাসপাতালে ভরতি করানোর পর প্রয়োজন হয়ে পড়ল রক্তের।ইরানে কর্মরত পুত্রের এক বন্ধুর দান করা রক্তেই শেষপর্যন্ত প্রাণে বাঁচলেন বৃদ্ধ।স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল গোটা পরিবার।পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া থানার অন্তর্গত গাজিপুর গ্রামের বাসিন্দা শামু শেখ।তাঁর এক পুত্র ফরোজ শেখ দীর্ঘদিন যাবৎ ইরানে কর্মরত।তিনি সেদেশের একটি সংস্থায় হিসাবরক্ষকের কাজ করছেন।বছর তিরিশের ফরোজের সঙ্গে দীর্ঘদিন বন্ধুত্বের সম্পর্ক অর্পণ ঘোষের।নিকটবর্তী দাঁইহাট শহরের বেড়া ঘোষপাড়া নিবাসী অর্পণ একটি বহুজাতিক সংস্থার ফার্মাসিস্ট রূপে কাটোয়াতে কর্মরত।কয়েক হাজার মাইল দূরে থাকলেও দুই বন্ধুর মধ্যে ফোনের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগটা রয়েছে।বর্তমানে জাতপাত আর ধর্মান্ধতায় রাজনীতির বিষবাষ্প দিকে দিকে যতই ছড়িয়ে পড়ুক না কেন এই দুই ভিনধর্মী যুবকের বন্ধুত্বের বন্ধনকে তা স্পর্শ করতে পারেনি।এদিনের ঘটনা প্রসঙ্গে জানা গিয়েছে, বছর পঁয়ষট্টির শামু শেখ বেশ কিছুদিন ধরে বার্ধক্যজনিত অসুখবিসুখে ভুগছিলেন।এজন্য কিছু কিছু ওষুধও খেতেন তিনি।তবে, এরই মধ্যে ইরানে কর্মরত পুত্রের জন্য তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তে থাকেন এবং ২২ ফেব্রুয়ারি তাঁকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালে ভরতি করা হয়।কিন্তু, তাঁকে সুস্থ করে তোলার জন্য রক্তের প্রয়োজন।বৃদ্ধের শরীরে ‘এ-পজিটিভ’ রক্ত।সেই গ্রুপের রক্তের ব্যবস্থা করতে না পারলে বৃদ্ধের প্রাণসংশয় দেখা দিতে পারে।এমতাবস্থায় ইরানে কর্মরত ফরোজের কাছেও সেই সংবাদ গিয়ে পৌঁছয়।ফরোজ সেখান থেকেই তৎক্ষনাৎ অর্পণকে ফোনমেসেজে পিতার সংকটজনক পরিস্থিতির কথা জানান।এরপর অর্পণ নিজেই রক্তদানের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়ে প্রবাসী বন্ধুকে আশ্বস্ত করেন।পরদিন সকালেই তিনি কাটোয়া মহকুমা হেমরাজ ব্লাড ব্যাঙ্কে গিয়ে রক্তদান করার পর নিজের কর্মক্ষেত্রে যোগ দেন।রক্তের যে কোনও জাত থাকতে পারে না তা আরও একবার প্রমাণ হয়ে গেল এবং এই বঙ্গের এক তরতাজা শিক্ষিত যুবক অর্পণ ঘোষ সেটাই ধর্ম বিদ্বেষীদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন।সোমবার দুপুরে কাটোয়ায় নিজের কর্মস্থলে বসে অর্পণ বলেন, মানবধর্মই আমার কাছে শ্রেষ্ঠ ধর্ম।সেজন্য আমি একজন মানুষ হিসেবে আরেকজন মানুষের পাশে আমার সামর্থ্যমতো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।তাই ইরান থেকে ফরোজের ফোনকলে সব কিছু শোনার পরপরই বন্ধুর বাবার পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।এভাবেই আমরা একে অপরের বিপদে যদি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারি তাহলে এই সমাজটা আরও সুন্দর হয়ে উঠতে পারে বলে আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।
