Home Uncategorized অমৃত ভারত প্রকল্পে সেজে উঠছে ঐতিহ্যের মালদা টাউন স্টেশন

অমৃত ভারত প্রকল্পে সেজে উঠছে ঐতিহ্যের মালদা টাউন স্টেশন

0

মহানন্দা ও কালিন্দী নদীর পলিমাটিতে সিক্ত প্রাচীন ভূখণ্ড মালদহ, যার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুবিশাল সব স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ আর আমবাগানের স্নিগ্ধতা। ‘মালদহ’ বা ‘মালদা’ নামকরণের পেছনে লুকিয়ে আছে এক সমৃদ্ধ অতীত। ঐতিহাসিকদের মতে, ফারসি শব্দ ‘মাল’ (সম্পদ) এবং আরবি শব্দ ‘দহ’ (জলাশয়)—এই দুইয়ের মিলনে তৈরি হয়েছে ‘মালদহ’ অর্থাৎ এমন এক ভূমি যা সম্পদে পরিপূর্ণ এবং নদী-নালায় পরিবেষ্টিত। আবার অনেকের মতে, প্রাচীন ‘মল্ল’ জাতিগোষ্ঠীর বসবাস থেকেই এই নামের উৎপত্তি।

মালদা যেন এক জীবন্ত মিউজিয়াম। স্টেশন থেকে সামান্য দূরেই সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে বড়সোনা মসজিদ, যার পাথুরে গায়ে আজও খোদাই করা বাংলার সুলতানদের অনবদ্য স্থাপত্যশৈলী। ফিরোজ মিনার বা দাখিল দরওয়াজা পেরিয়ে পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদের বিশালতার সামনে দাঁড়ালে সময় যেন আজও থমকে যায় অজানা এক অতীতে।

মালদার পর্যটনশিল্প ও অর্থনীতি উভয়কেই দীর্ঘদিন ধরে সচল রেখে আসছে ভারতীয় রেল। শিয়ালদহ থেকে গৌড় এক্সপ্রেস হোক বা হাওড়া থেকে বন্দে ভারত, রেলপথ মালদাকে কলকাতার দোরগোড়ায় এনে দিয়েছে। কেবল যাত্রী পরিবহনই নয়, মালদার বিশ্ববিখ্যাত ফজলি আম এবং রেশম শিল্পকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিয়ে স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে রেলের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কয়েক দশক ধরে মালদা টাউন স্টেশন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে নবাবী ইতিহাসের চাবিকাঠি পৌঁছে দিয়ে চলেছে।

তবে এবার প্রেক্ষাপট বদলাচ্ছে। ‘অমৃত ভারত স্টেশন’ প্রকল্পের অধীনে মালদা টাউন স্টেশন সেজে উঠছে এক নতুন রূপে। এটি কেবল স্টেশনের সাধারণ সংস্কার নয়, বরং আধুনিকতার সাথে ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। যাত্রীদের সর্বোচ্চ স্বাচ্ছন্দ্য ও বিশ্বমানের পরিষেবা প্রদানের লক্ষ্যে ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই স্টেশনটির ব্যাপক আধুনিকীকরণ করা হচ্ছে।

এই প্রকল্পের আওতায় স্টেশনে বিভিন্ন নতুন সুযোগ-সুবিধা যুক্ত হচ্ছে, স্টেশনের বাইরের দিকটি সম্পূর্ণ নতুন এবং দৃষ্টিনন্দন নকশায় সাজিয়ে তোলা হচ্ছে। সহজে চলাফেরার জন্য থাকছে সুপ্রশস্ত নতুন সার্কুলেটিং এরিয়া। নতুন কনকোর্স এরিয়ায় থাকছে উন্নত ‘এয়ার কুলিং’ এবং ‘এক্সস্ট সিস্টেম’, যা ভিড়ের মধ্যেও স্টেশন চত্বরকে আরামদায়ক রাখবে। প্ল্যাটফর্মের উপরিভাগ মসৃণ ও উন্নত করা হচ্ছে, যাতে যাত্রীরা নিরাপদে যাতায়াত করতে পারেন। পর্যাপ্ত পানীয় জলের জন্য ‘ওয়াটার বুথ’, বিলাসবহুল আধুনিক ওয়েটিং হল বা লাউঞ্জ এবং ফুড কোর্ট তৈরি করা হচ্ছে। স্টেশনে তৈরি হচ্ছে বিশাল রুফ প্লাজা। স্মার্ট কানেক্টিভিটির জন্য ডিজিটাল ডিসপ্লে, উন্নত সিসিটিভি নজরদারি এবং যাত্রীদের জন্য আধুনিক ইনফরমেশন কিয়স্ক বসানো হচ্ছে, যা স্টেশনটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। থাকছে মাল্টি-লেভেল পার্কিং এবং উন্নত লিফট ও এসকেলেটর, যা স্টেশনটির চেহারাকে অনেকটা বিমানবন্দরের মতো অত্যাধুনিক করে তুলবে।

আজ মালদা টাউন স্টেশন কেবল একটি রেলওয়ে জংশন নয়, বরং অমৃত ভারত প্রকল্পের হাত ধরে উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের এক নতুন ‘গেটওয়ে’ হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছে। এই আধুনিকীকরণ কেবল যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; স্টেশনের এই ভোলবদল মালদার পর্যটনশিল্পে নতুন জোয়ার আনবে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা দেখে উৎসাহিত হবেন দেশি-বিদেশি পর্যটকরা, যার সরাসরি সুফল পাবে স্থানীয় হোটেল ব্যবসা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং হস্তশিল্প। উন্নত পরিকাঠামোর অর্থ হলো আরও বেশি বিনিয়োগ এবং বিপুল কর্মসংস্থান।

রাতের মালদা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে যখন ট্রেনের নীল আলো এসে পড়ে, তখন সেই আলোয় দেখা দেয় এক নতুন মালদার স্বপ্ন—যে মালদা গম্ভীরা গানের সুরে তার আদিনা-গৌড়ের প্রাচীন ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে, অমৃত ভারত প্রকল্পের আধুনিক ট্রেনে চড়ে উন্নয়নের গন্তব্যের দিকে দ্রুতবেগে ছুটছে। মালদা টাউন স্টেশন তাই আজ কেবল একটি গন্তব্য নয়, এক উজ্জ্বল আগামীর সূচনা।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Exit mobile version