অভীক মিত্র, সিউড়ি : বয়সের ভারে শরীর মাঝেমধ্যে বিদ্রোহ করে । তবুও বয়সকে তুড়ি মেরে ১৫বছর ধরে স্বেচ্ছা পাঠদান করে চলেছেন নানুর ব্লকের চারকলগ্রামের ৭৭ বছরের বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় । গ্রামের স্কুলেই সংস্কৃতের শিক্ষক ছিল । ২০০৯ সালে অবসর নেন কিন্তু স্কুল ছেড়ে আসা হয় নি । স্কুলে তখন ওই বিষয়ের অন্য কোনো শিক্ষক ছিল না । তাই সপ্তাহে তিনদিন একাদশ এবং দ্বাদশ শ্রেণিতে স্বেচ্ছায় সংস্কৃত পড়িয়েছেন । ২০১৩ সালে সংস্কৃতের শিক্ষক আসার পর ওই স্কুল থেকে অব্যহতি মেলে কিন্তু স্বেচ্ছাপাঠদান থেমে থাকে নি কারণ ওই স্কুলে স্বেচ্ছাপাঠদানের সময়
নানুরের চন্ডীদাস উচ্চ বিদ্যালয় থেকেও সংস্কৃত পড়ানোর অনুরোধ আসে । সেই অনুরোধ ফেরাতে পারেন নি । ওই স্কুলেরই ছাত্র ছিলেন তিনি । ২০১১ সাল থেকে একসঙ্গে সেখানেও সপ্তম এবং অষ্টম শ্রেণিতে সপ্তাহে ৪ দিন স্বেচ্ছাপাঠদান শুরু করেন । আজও সেখানে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পাঠদান করে চলেছেন । তাঁরজন্যেই ওই স্কুলে ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে উচ্চমাধ্যমিকস্তরে সংস্কৃত পড়ানোর অনুমোদন মেলে । তখন বিষয় ভিত্তিক কোন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক স্বেচ্ছা পাঠদানের দায়িত্ব নিলে অনুমোদন পাওয়া যেত । ছাত্রছাত্রীদের কথা ভেবে তিনি হাসি মুখে সেই দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেন । আজও সেই দায়িত্ব পালন করে চলেছেন । পাশাপাশি বছর নয়েক ধরে সপ্তাহে ২দিন চারকলগ্রাম জুনিয়র বালিকা বিদ্যালয়েও স্বেচ্ছাপাঠদান করছেন । সেখানে সপ্তম এবং অষ্টম শ্রেণিতে সংস্কৃত পড়ান। আগে বাড়ি থেকে নিয়মিত সাইকেলে ৬ কিমি দূরের নানুর স্কুলে আসতেন ।এখন বয়সজনিত কারণে টোটো ভাড়া করে আসেন । নানুর স্কুলের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী নিশা দাস, রাজ শেখ,দ্বাদশ শ্রেণির সুদীপা লাহা,সৈয়দ রাহাত আলি,চারকলগ্রাম জুনিয়ার বালিকা বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির মেঘনা ঘোষ,সপ্তম শ্রেণির সমাপ্তি দাসরা জানিয়েছে, “ঝড়বৃষ্টির দিনে আমরা সময়মতো স্কুলে আসতে না পারলেও স্যার ঠিক হাজির হন । আমাদের জন্য অপেক্ষায় থাকেন । তাঁর পড়ানোর গুণেই সংস্কৃত পড়াটা সহজ হয়েছে ।” স্ত্রী মাধবী,দুই ছেলে পঞ্চানন ও নিরঞ্জন, মেয়ে প্রতিমা এবং নাতি নাতনিদের নিয়ে ভরা সংসার । ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন স্কুল কলেজে শিক্ষকতা করেন । স্ত্রী বলেন , “জ্বরজ্বালা যাই হোক না কেন স্কুলে যাওয়ার জন্য ওনার আগের মতোই ১০টার আগে ভাত চাই । অবসর নিয়েছেন তা মনেই হয় না ।” চারকলগ্রাম জুনিয়ার বালিকা বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষিকা মৌকন্যা মুখোপাধ্যায় বলেন, “এমনিতেই আমাদের স্কুলে স্থায়ী শিক্ষক শিক্ষিকা কম । উনি না থাকলে হয়তো সংস্কৃত পড়ানোই হোত না ।” নানুর হাইস্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক অরিজিৎ দাস বলেন, “আমাদের স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও ওঁনার জন্য সংস্কৃত পড়ার সুযোগ পাচ্ছে । অথচ উনি স্কুল যাওয়া আসার টোটো ভাড়াটিও নেন না ।” বিশ্বনাথ জানান, “আমি মনে করি শিক্ষিত ব্যক্তিদের শিক্ষাক্ষেত্রের কাছে একটা ঋণ থাকে । আমি স্বেচ্ছাপাঠদান করে সেই ঋণের কিছুটা শোধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। যতদিন পারবো চেষ্টা চালিয়ে যাবো ।”
