Home Uncategorized রোদ-বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মায়ের কেশসজ্জা, বড়গাছিয়া-পার্বতীপুরের কারিগরদের ঘরে এখন নাওয়া-খাওয়ার সময়...

রোদ-বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মায়ের কেশসজ্জা, বড়গাছিয়া-পার্বতীপুরের কারিগরদের ঘরে এখন নাওয়া-খাওয়ার সময় নেই

0

সুমন আদক, হাওড়া: মৃৎশিল্পীর তুলির টানে যখন ধীরে ধীরে প্রাণ পেতে শুরু করেন দেবী দুর্গা, তখন তাঁর সাজসজ্জার শেষ পর্বে নীরবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন আরও একদল শিল্পী। তাঁদের হাতে তৈরি হয় দেবীর কেশ। মাটির প্রতিমা তৈরি থেকে রং-রূপের কাজ—সবকিছুর শেষে প্রতিমার সৌন্দর্যকে পূর্ণতা দেয় যে চুল, তার পিছনেও রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, দক্ষতা এবং একান্ত নিজস্ব শিল্পকৌশল। দুর্গাপুজো যত এগিয়ে আসছে, ততই ব্যস্ততা বাড়ছে হাওড়ার বড়গাছিয়া পূর্বপাড়া ও পার্বতীপুর মল্লিকপাড়ার চুল তৈরির কারিগরদের ঘরে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই এলাকার বহু পরিবার জড়িয়ে রয়েছে প্রতিমার চুল তৈরির সঙ্গে। পুজোর প্রায় চার মাস আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় কাজের তোড়জোড়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে পাটের আঁশ বাছাই, রং করা, শুকনো করা এবং বিভিন্ন ধাপে তা প্রক্রিয়াজাত করে প্রতিমার উপযোগী কেশসজ্জা তৈরির কাজ। কিন্তু এবার সেই ব্যস্ততার মাঝেই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আকাশের মুখভার। বারবার বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে পাটের আঁশ। আর তাতেই বাড়ছে শুকনোর সময়, কমছে কাজের গতি। কারিগরদের কথায়, এই শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পাটের আঁশ। প্রথমে সেই আঁশকে কালো রং করা হয়। তারপর রোদে ভালোভাবে শুকিয়ে নেওয়া হয়। শুকনো আঁশকে বিভিন্ন কৌশলে প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হয় প্রতিমার চুল। চুলের ধরন, দৈর্ঘ্য ও প্রয়োজন অনুযায়ী চলে আলাদা আলাদা কাজ। তৈরি হয়ে যাওয়ার পর সেই কেশসজ্জা পৌঁছে যায় হাওড়া-সহ বিভিন্ন এলাকার প্রতিমাশিল্পীদের কাছে। কারিগরদের ঘরে এই সময় যেন উৎসবের আলাদা ব্যস্ততা। পরিবারের পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারাও সমান তালে হাত লাগান কাজে। কেউ আঁশ পরিষ্কার করছেন, কেউ রং করছেন, কেউ শুকনো আঁশ গুছিয়ে নিচ্ছেন, আবার কেউ তৈরি করছেন চুলের গোছা। সংসারের নিত্যদিনের কাজের ফাঁকেই চলে এই শিল্পের কাজ। সারা বছরই কমবেশি চাহিদা থাকলেও দুর্গাপুজোর আগে কয়েক মাসে কাজের চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কারণ, একসঙ্গে বহু প্রতিমার অর্ডার সামলাতে হয়। সময়মতো প্রতিমাশিল্পীদের কাছে চুল পৌঁছে দিতে না পারলে পিছিয়ে পড়তে পারে গোটা প্রতিমা তৈরির প্রক্রিয়াই। তাই পুজোর মুখে দিন-রাত এক করে কাজ করেন কারিগররা। তবে এ বছর প্রকৃতিই যেন তাঁদের পরীক্ষা নিচ্ছে। মাঝেমধ্যেই ভারী বৃষ্টি আর মেঘলা আকাশে ঠিকমতো রোদ না মেলায় আঁশ শুকোতে সময় লাগছে বেশি। কোথাও শুকোতে দেওয়া আঁশ আচমকা বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে, কোথাও আবার ভেজা আঁশ শুকোনোর জন্য নতুন করে জায়গা তৈরি করতে হচ্ছে। ফলে একই কাজ করতে সময়ও লাগছে বেশি। কারিগরদের কাছে রোদ শুধু আবহাওয়ার একটি অংশ নয়, বরং তাঁদের কাজের অন্যতম নির্ভরতা। পর্যাপ্ত রোদ না থাকলে কাঁচামাল শুকোয় না, আর কাঁচামাল ঠিকমতো শুকোতে না পারলে পরবর্তী ধাপের কাজও শুরু করা যায় না। তাই আকাশের দিকে তাকিয়েই এখন অনেকটা সময় কাটছে তাঁদের। কখন রোদ উঠবে, কখন ভেজা আঁশ শুকোবে—তার উপর নির্ভর করছে কাজের গতি। তবু পুজোর আগে কাজ থামিয়ে রাখার সুযোগ নেই। বৃষ্টি থামলেই ফের কাজে নেমে পড়ছেন কারিগররা। কারণ তাঁদের তৈরি করা চুল দিয়েই তো সাজবেন মৃন্ময়ী মা। মণ্ডপে ঢাকের বাদ্যি, ধূপের গন্ধ আর আলোর ঝলকানির মধ্যে দর্শনার্থীদের চোখে পড়বে দেবীর সাজ। কিন্তু সেই সাজের নেপথ্যে বড়গাছিয়া ও পার্বতীপুরের এই কারিগরদের ঘাম, অপেক্ষা আর নিখুঁত হাতের কাজের কথা হয়তো অনেকেরই অজানা থেকে যাবে। পুজোর কয়েকদিন আগে তাঁদের ঘরে তাই এখন উৎসবের থেকেও বেশি কর্মযজ্ঞ। রোদ-বৃষ্টির সঙ্গে লড়াই করেই তাঁরা তৈরি করে চলেছেন দেবীর কেশসজ্জা। তাঁদের হাতের সেই নিপুণ কাজেই শেষ মুহূর্তে পূর্ণতা পাবে মৃন্ময়ী মায়ের রূপ। আর সেই রূপের আড়ালে থেকে যাবে একদল নীরব শিল্পীর গল্প—যাঁদের হাত ছাড়া বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসবের সাজ যেন অসম্পূর্ণ।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Exit mobile version