সুন্দরবনের প্রত্যন্ত ও নদীবেষ্টিত দ্বীপ অঞ্চলের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় এক ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হলো। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং যাতায়াতের নানা প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে অবশেষে সাগরদ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের সেই প্রতীক্ষিত ও তীব্র দাবি বাস্তবায়িত হলো। স্থানীয় সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সংক্রান্ত দুর্ভোগের স্থায়ী অবসান ঘটিয়ে সাগর গ্রামীণ হাসপাতালে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হলো একটি বিশেষ চাইল্ড স্পেশালিস্ট ইউনিট বা শিশু চিকিৎসা বিভাগ।সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার তথা দেশের অন্যতম বৃহত্তম ও জনবহুল দ্বীপ হলো এই সাগরদ্বীপ। চারপাশ নদী দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকায় এখানকার ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত দুর্গম। অতীতে সাগরদ্বীপের সাধারণ মানুষকে যেকোনো জটিল চিকিৎসার জন্য, বিশেষ করে শিশুদের জরুরি প্রয়োজনে নদী পার হয়ে মূল ভূখণ্ডের কাকদ্বীপ, ডায়মন্ড হারবার কিংবা কলকাতা পর্যন্ত ছুটতে হতো। বিশেষ করে নদী পার হয়ে রোগী নিয়ে যাওয়া দ্বীপবাসীদের জন্য এক বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার সমান ছিল। নদীপথের এই যাতায়াতের সমস্যায় শিশুদের নিয়ে বাইরে যাওয়া এবং চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পৌঁছানো খুব সমস্যায় পড়তে হতো দ্বীপবাসীকে। বর্ষার সময়ে উত্তাল নদী পারাপারের ঝুঁকি কিংবা রাতের বেলা আকস্মিক কোনো শারীরিক সংকটে দ্বীপবাসীকে চরম অনিশ্চয়তা ও হেনস্তার শিকার হতে হতো। বহু ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পৌঁছাতে না পেরে শিশুদের জীবন বিপন্ন হওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটেছিল। দ্বীপবাসীর এই দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা, বুকফাটা কান্না এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত অসহনীয় সংকটের কথা গভীরভাবে অনুধাবন করে সাগর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক সুমন্ত মণ্ডলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অবশেষে এই বিশেষ ইউনিট চালু করা সম্ভব হলো। নির্বাচনী জনসভায় সাধারণ মানুষকে দেওয়া কথা রক্ষা করে সাগর গ্রামীণ হাসপাতালে একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ করা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আপাতত সপ্তাহের চার দিন— সোম, মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার— এই নির্দিষ্ট দিনগুলিতে শিশুদের বিশেষ চিকিৎসা পরিষেবা প্রদান করা হবে। এর ফলে এলাকার প্রতিটি শিশু ঘরের কাছেই নামী চিকিৎসকদের পরামর্শ ও চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ পাবে এবং আর আগের মতো দূরদূরান্তে বা বাইরে ছোটার বিড়ম্বনা পোহাতে হবে না।
এই শুভ উদ্বোধনের পর সাগর গ্রামীণ হাসপাতালের ব্লক মেডিক্যাল অফিসার অফ হেলথ ডা. তন্ময় ঘোষ অত্যন্ত আশাবাদী সুরে জানান, “সাগরদ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের এই স্বাস্থ্য পরিষেবা সংক্রান্ত দাবি আজ সফলভাবে পূরণ হলো। আমরা এখানেই থেমে থাকছি না, ভবিষ্যতে আরও একজন শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে এই হাসপাতালে যুক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য হলো মোট দুজন ডাক্তার বাবুর মাধ্যমে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জীবনদায়ী পরিষেবা সাগরদ্বীপের প্রতিটি মানুষের কাছে নিরবচ্ছিন্নভাবে পৌঁছে দেওয়া। বিধায়ক সুমন্ত মণ্ডল ও রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের এই যৌথ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপে অত্যন্ত আপ্লুত ও আনন্দিত সাগরদ্বীপের সর্বস্তরের মানুষ। এলাকার অভিভাবক, মা-বাবা এবং সচেতন নাগরিকরা এই উদ্যোগকে আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, ঘরের কাছেই এমন একটি উন্নত শিশু চিকিৎসালয় চালু হওয়ায় তাঁদের দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা, হয়রানি ও অর্থনৈতিক চাপ অনেকটাই কমল। সর্দি-কাশি, জ্বর কিংবা শিশুদের যেকোনো জরুরি শারীরিক সমস্যার জন্য আর নদী পার হয়ে বাইরে যাওয়ার দুশ্চিন্তা করতে হবে না। সাগর গ্রামীণ হাসপাতালে এই চাইল্ড স্পেশালিস্ট ইউনিট চালুর মাধ্যমে দ্বীপের গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবা এক সম্পূর্ণ নতুন ও উন্নত দিশা পেল। সুন্দরবনের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানসম্মত ও আধুনিক স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার এই পদক্ষেপ আগামী দিনে সাগরদ্বীপবাসীর জীবনযাত্রাকে আরও সহজ করবে এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ইতিহাসকে এক নতুন আশার আলোয় পূর্ণ করবে।
