নিজস্ব প্রতিনিধি ,কলকাতা/জামশেদপুর: পারিবারিক সম্পর্ক, মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার গল্প নিয়ে নির্মিত বাংলা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘প্রায়শ্চিত্ত’ (Prayashchitta) এবার চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে পা রাখতে চলেছে। করুণা, কৃতজ্ঞতা, আত্মসমালোচনা ও মানবিকতার মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে নির্মিত এই ছবিটি ইতিমধ্যেই আসন্ন ‘জামশেদপুর শর্টস’ ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে জমা দেওয়া হয়েছে। উৎসব পর্ব শেষ হলে ছবিটি সাধারণ দর্শকদের জন্য ইউটিউবে মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ছবিটির পরিচালনা করেছেন মধ্যমগ্রামের স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা সুপ্রিয় মুখার্জী। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে তথ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত তিনি। সামাজিক বাস্তবতা ও মানবিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে গল্প বলাই তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণের মূল লক্ষ্য।
ছবি প্রসঙ্গে সুপ্রিয় মুখার্জী বলেন, “একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আমার চেষ্টা সবসময় বাস্তব জীবনের গল্প, মানুষের সম্পর্ক এবং সামাজিক বাস্তবতাকে পর্দায় তুলে ধরা। আমাদের বাজেট বা কোনো বিনিয়োগকারী ছিল না, কিন্তু পুরো টিমের আন্তরিক সহযোগিতা ও নিষ্ঠাতেই এই ছবি তৈরি হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, ‘প্রায়শ্চিত্ত’ দর্শকদের ভাবতে বাধ্য করবে এবং মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করাবে।”

ছবির গল্প ও চিত্রনাট্য লিখেছেন জামশেদপুরের বিশিষ্ট সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক ও শ্রুতি-নাট্যকার শান্তিরঞ্জন চক্রবর্তী। তাঁর একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং সাহিত্য ও গল্প রচনায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। শ্রুতি নাটকের জগতেও তিনি সুপরিচিত। শুটিং শুরুর আগে শিল্পীদের জন্য অভিনয় কর্মশালার আয়োজনও করেন তিনিই।
সুপ্রিয় মুখার্জী ও শান্তিরঞ্জন চক্রবর্তী ভিন্ন পেশার মানুষ হলেও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতি তাঁদের সমান আগ্রহ থেকেই এই যৌথ উদ্যোগের সূচনা। বিহার বেঙ্গলি সমিতির প্রাক্তন সম্পাদক শ্রী সুনির্মল দাসের অনুপ্রেরণায় তাঁরা একসঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাণের পথচলা শুরু করেন।
ছবিটির চিত্রগ্রহণ ও সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন নীল রায়। প্রধান চরিত্রে ছেলে ও মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন বিশ্বরূপ নাগ ও লোপামুদ্রা সিংহ দেব। এছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন শান্তিরঞ্জন চক্রবর্তী, সঞ্জীব পাত্র, শম্ভু বন্দ্যোপাধ্যায়, সোমা বসু এবং শ্যামলী চক্রবর্তী। অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুদীপা সরকার, রিয়া বন্দ্যোপাধ্যায়, সুপ্রিয় মুখার্জী ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শিশু শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন রানি মণ্ডল, হৃষাণ সেনগুপ্ত ও সম্রাট মৈত্র।
ছবির অধিকাংশ শিল্পীই জামশেদপুরের বাসিন্দা। শুটিং হয়েছে জামশেদপুর ও কলকাতার বিভিন্ন স্থানে। ছবির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কলকাতায়।
‘প্রায়শ্চিত্ত’-এর কাহিনি আবর্তিত হয়েছে আমেরিকাপ্রবাসী এনআরআই অনুপমকে ঘিরে। তিনি তাঁর বিধবা মাকে সঙ্গে নিয়ে আমেরিকায় ফিরে যেতে ভারতে আসেন। কিন্তু তাঁর মা সমাজ ও আশপাশের মানুষের প্রতি নিজের দায়িত্ব ছেড়ে যেতে অস্বীকার করেন। এরপর একাধিক ঘটনার মধ্য দিয়ে অনুপম উপলব্ধি করতে শেখে যে জীবনের প্রকৃত সমৃদ্ধি ভৌতিক আরাম-আয়েশে নয়, বরং ভালোবাসা, মানবিকতা, সেবা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই নিহিত। ‘প্রায়শ্চিত্ত’ সেই আত্মউপলব্ধি, অনুতাপ এবং মানবিক মূল্যবোধের এক হৃদয়স্পর্শী কাহিনি।
সীমিত আর্থিক সামর্থ্য ও বিনিয়োগকারীর অনুপস্থিতিতেও এই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি প্রমাণ করে যে শক্তিশালী গল্প, নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী-কলাকুশলী এবং সৃজনশীল ভাবনা থাকলে স্বাধীন চলচ্চিত্রও দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলতে সক্ষম।