ভারতের প্রতিটি বস্ত্রপণ্য কাপড়ের চেয়েও অনেক বড় একটি কাহিনী বহন করে। এটি সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং নীরব রূপান্তরের গল্প। এটি একজন মহিলার মর্যাদার সঙ্গে কর্মজীবনে প্রবেশের, একটি পরিবারের স্থিতিশীল আয়ের মাধ্যমে স্থিরতা খুঁজে পাওয়ার এবং প্রথম প্রজন্মের একজন উদ্যোক্তার দক্ষতাকে আত্মনির্ভরশীলতায় রূপান্তরিত করার প্রতিফলন। গত ১১ বছরে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর দৃঢ় ও দূরদর্শী নেতৃত্বে ভারতের বস্ত্রশিল্প একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প থেকে একটি শক্তিশালী, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী এবং জন-কেন্দ্রিক উন্নয়নের ইঞ্জিনে পরিণত হয়েছে। এটি আত্মনির্ভর ভারতের প্রকৃত চেতনাকে মূর্ত করে তুলেছে।
চাহিদা, পরিধি এবং রপ্তানি: উন্নয়নের ভিত্তি ভারতের বস্ত্রশিল্পের পুনরুজ্জীবন শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ১৪০ কোটিরও বেশি তরুণ, উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং ক্রমবর্ধমান শহুরে ও গ্রামীণ জনসংখ্যা নিয়ে ভারত বিশ্বের অন্যতম স্থিতিস্থাপক বস্ত্রবাজার। এই রূপান্তরের পরিধি সংখ্যাতেই স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। ভারতের অভ্যন্তরীণ বস্ত্রবাজার মাত্র পাঁচ বছরে প্রায় ৮.৪ লক্ষ কোটি টাকা থেকে বেড়ে আনুমানিক ১৩ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ব্যবহারের প্রবণতা এই গতিকে আরও জোরদার করেছে: গত এক দশকে মাথাপিছু বস্ত্রের ব্যবহার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা ২০১৪-১৫ সালের প্রায় ৩,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ সালে ৬,০০০ টাকারও বেশি হয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এটি আবারও দ্বিগুণ হয়ে ১২,০০০ টাকায় পৌঁছাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। রপ্তানিও এই চাহিদা-চালিত সম্প্রসারণকে প্রতিফলিত করেছে। কোভিড অতিমারীর বছর ২০১৯-২০ সালে বস্ত্র ও পোশাক রপ্তানি ২.৪৯ লক্ষ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ সালে প্রায় ৩.৫ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছ। কোভিড-পরবর্তী সময়ে এক্ষেত্রে প্রায় ২৮% বৃদ্ধি নির্দেশিত হয়েছে। এই দ্রুত পুনরুদ্ধার ভারতের উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর ক্ষমতাকে তুলে ধরে। এর মাধ্যমে ভারত আন্তর্জাতিক চাহিদা ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বস্ত্রশিল্পের মূল্য শৃঙ্খল জুড়ে রপ্তানি বৃদ্ধিকে কর্মসংস্থানে রূপান্তরিতও করতে পারে।
বস্ত্রশিল্প ভারতের কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে
বস্ত্রশিল্প ভারতের কর্মসংস্থান অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে চলেছে। বর্তমানে, এই ক্ষেত্রটি কৃষির পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নিয়োগকর্তা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩-২৪ সালের শেষ নাগাদ এই ক্ষেত্রে প্রায় ৫.৬ কোটি মানুষকে সরাসরি সহায়তা করেছে। ২০১৪ সাল থেকে এই কর্মীবাহিনী প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কোভিড-পরবর্তী পর্যায়টি বিশেষভাবে রূপান্তরমূলক ছিল: ২০২০ সাল থেকে রপ্তানি-নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন শুধুমাত্র সংগঠিত ক্ষেত্রেই আনুমানিক ১.৫ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। যখন শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য বিস্তৃত অসংগঠিত বাস্তুতন্ত্রের হিসাব করা হয়, তখন কর্মসংস্থানের পরিমাণ অনেক বেশি হয়, যা বস্ত্রকে ভারতের জীবিকার সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং স্থিতিস্থাপক ইঞ্জিনগুলির মধ্যে একটি হিসাবে তুলে ধরে।
সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সেলাই মেশিনের প্রভাব
এই রপ্তানি স্থিতিস্থাপকতার পেছনে রয়েছে সক্ষমতা-ভিত্তিক উন্নয়নের দিকে একটি নির্ণায়ক পরিবর্তন। গত এক দশকে বস্ত্র ক্ষেত্রের সম্প্রসারকে আলোচ্য নয় এমন যে বিষয়টি বিশেষভাবে চালিত করেছে তা হল সেলাই মেশিন। একটি যন্ত্রের চেয়েও বেশি কিছু হিসেবে, সেলাই মেশিন উন্নয়নের অনুঘটক হয়ে উঠেছে। এটি প্রমাণ করে যে কখনও কখনও সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান এবং শিল্প রূপান্তর শুরু হয় সবচেয়ে ছোট যন্ত্র দিয়ে। শুধু কোভিড অতিমারির পর থেকেই ভারতের উৎপাদন ব্যবস্থায় ১.৮ কোটিরও বেশি সেলাই মেশিন আমদানি করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ সালে আমদানি রেকর্ড সংখ্যক ৬১ লাখ মেশিনে পৌঁছেছে, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। প্রতিটি মেশিন কাপড় থেকে পোশাক পর্যন্ত মূল্য শৃঙ্খল জুড়ে প্রায় ১.৭ জন কর্মীর কর্মসংস্থানকে সমর্থন করে। ফলস্বরূপ, অতিমারীর পরবর্তী সময়ে সেলাই মেশিন আমদানির এই ব্যাপকতা বস্ত্র ক্ষেত্রে ৩ কোটিরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছে। এটি সক্ষমতা সম্প্রসারণকে বৃহৎ আকারের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত করেছে।
সক্ষমতার এই ব্যাপকতাই ব্যাখ্যা করে যে কেন আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ফিরে আসার সময় ভারতীয় কারখানাগুলো প্রস্তুত ছিল এবং তারা উচ্চতর উৎপাদন, কম লিড টাইম ও শক্তিশালী কমপ্লায়েন্স সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছিল। কর্মসংস্থান সৃষ্টি কেবল আধুনিক কারখানাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ইউনিটগুলো উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, পুরোনো মেশিনগুলো ধূসর বাজারে চলে যায় এবং ছোট উদ্যোগ, দর্জির দোকান ও গৃহভিত্তিক ব্যবসাগুলো দ্বারা পুনরায় ব্যবহৃত হয়, যা তৃণমূল পর্যায়ে কর্মসংস্থানকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে। মহিলা, গ্রামীণ যুবক এবং প্রথম প্রজন্মের উদ্যোক্তারা এই বিকেন্দ্রীভূত সম্প্রসারণের কেন্দ্রে রয়েছেন। বিশেষ করে অসংগঠিত ক্ষেত্রে এই কর্মসংস্থানের পূর্ণাঙ্গ চিত্রকে স্বীকৃতি দিতে এবং ধারণ করতে সরকার জেলাভিত্তিক বস্ত্র রূপান্তর (ডি এল টি টি) উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কর্মীবাহিনীকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়ে এবং তথ্য সংগ্রহের উন্নতি ঘটিয়ে, ডি এল টি টি -এর লক্ষ্য হলো এটি নিশ্চিত করা যে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি কেবল সংখ্যায় বড় হবে না, বরং দক্ষতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার দ্বারাও সমর্থিত হবে।
কারখানা থেকে কারিগর পর্যন্ত: সকলের জন্য কর্মসংস্থান
২০৩০ সালের জন্য আমাদের লক্ষ্য সুস্পষ্ট: বস্ত্রশিল্পকে ভারতের কর্মসংস্থান এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অন্যতম শক্তিশালী চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। ফাস্ট ফ্যাশন একটি শক্তিশালী নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। বর্তমানে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের আন্তর্জাতিক ফাস্ট ফ্যাশন বাজার ২০৩০ সালের মধ্যে ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। দ্রুত উৎপাদন এবং দ্রুত সরবরাহের জন্য এর চাহিদা ভারতকে একটি অনুকূল অবস্থানে রেখেছে এবং আগামী ৪ বছরে অতিরিক্ত ৪০ লক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পিএম মিত্র পার্কগুলোর একারই ২০ লক্ষেরও বেশি কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে পিএলআই স্কিমটি নতুন কারখানা এবং নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে ৩ লক্ষেরও বেশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। বৃহত্তর বস্ত্রশিল্প মূল্য শৃঙ্খলটি প্রায় ৫০ লক্ষ অতিরিক্ত জীবিকা তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিগুলো বস্ত্র রপ্তানি এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করছে, এবং আসন্ন ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটি নতুন বাজার উন্মুক্ত করবে, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াবে এবং কর্মসংস্থানের পরবর্তী ঢেউ তৈরি করবে।
শিল্প উন্নয়নের পাশাপাশি, ভারতের হস্তশিল্প এবং তাঁতশিল্প ক্ষেত্র টেকসই কর্মসংস্থানের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে চলেছে। ৬৫ লক্ষেরও বেশি কারিগর এবং তাঁতিকে সহায়তা প্রদানকারী এই ক্ষেত্রটি পরিবেশগতভাবে দায়িত্বশীল পণ্যের জন্য স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমানে রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৫০,০০০ কোটি টাকা, যা ২০৩২ সালের মধ্যে দ্বিগুণ করে ১ লক্ষ কোটি টাকায় উন্নীত করার সুস্পষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। সুনির্দিষ্ট প্রকল্প এবং বাজার প্রবেশের উদ্যোগের মাধ্যমে, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ২০ লক্ষ অতিরিক্ত কারিগর এবং তাঁতিকে কর্মীবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কোভিড-পরবর্তী সময়ে জীবিকা নির্বাহে বস্ত্রশিল্পের ভূমিকা
ভারতের বস্ত্রশিল্পের কাহিনীটি শেষ পর্যন্ত কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়—এটি বিশাল, বৈচিত্র্যময় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক। কোভিডের পর থেকে, ২০২০ থেকে ২০৩০ সালের দশকটি ভারতীয় বস্ত্রশিল্পকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চলেছে। সংগঠিত ও অসংগঠিত উভয় ক্ষেত্রে ৫ কোটিরও বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে প্রস্তুত। এটি প্রথম প্রজন্মের উদ্যোক্তা তৈরি করছে, মহিলাদের জন্য স্থিতিশীল চাকরির সুযোগ দিচ্ছে এবং গ্রামীণ যুবকদের জন্য নতুন পথ খুলে দিচ্ছে। ভারত যখন ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত ভারত গড়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বস্ত্রশিল্প একটি আত্মনির্ভরশীল, বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। আধুনিক সক্ষমতা, দক্ষ কর্মী এবং স্থিতিশীল চাহিদা একত্রিত হয়ে মর্যাদার সঙ্গে উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।
