Home Uncategorized চার শতাব্দীর ঐতিহ্যে আজও অমলিন দেবীবরণ, দশমীতে পান্তা খাইয়ে বিদায় আন্দুলের ভট্টাচার্য...

চার শতাব্দীর ঐতিহ্যে আজও অমলিন দেবীবরণ, দশমীতে পান্তা খাইয়ে বিদায় আন্দুলের ভট্টাচার্য বাড়িতে

0

সুমন আদক, হাওড়া: সময়ের স্রোতে বদলেছে সমাজ, বদলেছে জীবনযাত্রা, বদলেছে পুজোর আয়োজনও। কিন্তু হাওড়ার আন্দুলের দুইল্যা গ্রামের ভট্টাচার্য বাড়িতে দুর্গাপুজোর আচার-অনুষ্ঠানে আজও যেন থমকে রয়েছে ইতিহাস। চারশো বছরেরও বেশি সময় ধরে বংশপরম্পরায় চলে আসা এই পুজো এবছর ৪২২ বছরে পা দিয়েছে। জাঁকজমকের চেয়ে এখানে বড় হয়ে উঠেছে বিশ্বাস, পারিবারিক বন্ধন আর পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার অঙ্গীকার। এই বনেদি বাড়ির দুর্গোৎসবের বিশেষত্ব লুকিয়ে রয়েছে এমন কিছু প্রাচীন রীতিতে, যা আজকের দিনে অনেকটাই বিরল। দেবীকে পরিবারের আপনজনের মতোই যত্ন করা হয় এখানে। সপ্তমী থেকে প্রতিদিন সকালে দেবীর দাঁত মাজার জন্য দেওয়া হয় বেলগাছের ডাল ও এক ঘটি জল। তারপর নিবেদন করা হয় দুপুরের রান্না করা ভোগ। প্রতিদিনের ভোগে থাকে পায়েসও। পুজোর প্রতিটি পর্বে নিয়ম মেনে পালিত হয় প্রাচীন আচার। আর দশমী এলেই এই পুজো পায় এক স্বতন্ত্র আবেগের রং। সেদিন দেবীকে পান্তা খাইয়ে বিদায় জানান পরিবারের সদস্যরা। দেবীকে ঘরের মেয়ে হিসেবে আপন করে নেওয়া এবং বিদায়ের মুহূর্তকে পারিবারিক আবেগে জড়িয়ে রাখার এই রীতি ভট্টাচার্য বাড়ির পুজোকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। শুধু পরিবারের সদস্যরাই নন, এই বিশেষ মুহূর্তের সাক্ষী থাকতে এলাকার বহু মানুষও ভিড় জমান বাড়িতে। দশমীতে সিঁদুর খেলাতেও যোগ দেন স্থানীয় মহিলারা। পরিবারের সদস্য দুর্গাপ্রসন্ন ভট্টাচার্যের কথায়, তাঁদের পূর্বপুরুষেরা বর্ধমানের রাজাদের পুরোহিত ছিলেন। সেই সূত্রেই তাঁদের পূর্বপুরুষদের এই গ্রামে আগমন এবং পরবর্তীকালে পারিবারিক দুর্গাপুজোর সূচনা। তারপর প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে এসেছে সময়। কিন্তু পুজোর মূল রীতিনীতিতে পরিবর্তন আনেননি পরিবারের সদস্যরা। জন্মাষ্টমীর দিন কাঠামো পুজোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রতিমা তৈরির কাজ। বাড়ির নিজস্ব ঠাকুরদালানেই তৈরি হয় দেবীপ্রতিমা। অর্থাৎ প্রতিমা নির্মাণ থেকে পুজোর আয়োজন—সব কিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে পরিবারের দীর্ঘদিনের স্মৃতি ও আবেগ। পরিবারের মহিলা সদস্য মিতা ভট্টাচার্য জানান, পঞ্চমীর দিন থেকেই শুরু হয় দেবীর বোধন। সপ্তমী থেকে প্রতিদিন সকালে বেলগাছের ডাল ও জল দেওয়ার রীতি পালন করা হয়। পাশাপাশি সন্ধিপুজো ও নবমীতে রয়েছে বলির প্রথাও। প্রাচীন নিয়ম মেনে পুজোর প্রতিটি দিন কাটে নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। পারিবারিক পুজো হলেও ভট্টাচার্য বাড়ির দুর্গোৎসব আজ আর শুধু পরিবারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। এলাকার মানুষের অংশগ্রহণে এই পুজো পরিণত হয়েছে এক সামাজিক মিলনক্ষেত্রে। দেবীর কাছে পুজো নিবেদন থেকে দশমীর সিঁদুর খেলা—সবেতেই সামিল হন স্থানীয় বাসিন্দারা। বনেদি বাড়ির পুজোর আসল আকর্ষণ যে শুধু প্রতিমা, আলোকসজ্জা কিংবা আড়ম্বর নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করে চলা ইতিহাস ও পারিবারিক সংস্কৃতি, তারই যেন জীবন্ত উদাহরণ আন্দুলের দুইল্যা গ্রামের ভট্টাচার্য বাড়ি। ৪২২ বছরের দীর্ঘ পথ চলায় এই পুজো হয়ে উঠেছে অতীত ও বর্তমানের সেতুবন্ধন। আর দশমীর দিনে পান্তা খাইয়ে দেবীকে বিদায় জানানোর রীতি মনে করিয়ে দেয়—এখানে দুর্গা কেবল আরাধ্যা দেবী নন, তিনি পরিবারেরই এক আপনজন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Exit mobile version